যেভাবে শিকলবন্দী হলো মৌসুমীর জীবন

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত মোছা. মৌসুমী। সেটা বছর চারেক আগের কথা। ওই সময়ে তার মা রাগ করে বাবার সংসার ছেড়ে চলে যান। সেই থেকে মৌসুমী মানসিক ভারসাম্যহীন। এখন শিকলবন্দী হয়ে সারাটা সময় কাটে ১৩ বছরের এই কিশোরীর।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মৌসুমী। নিরাপত্তার বিষয় ভেবে এক বছর ধরে তাকে শিকলে বেঁধে রাখছে পরিবার। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, মা–বাবার কলহ দেখে একধরনের কষ্ট পেয়েছে মৌসুমী। ওই কষ্ট থেকেই তার সমস্যার শুরু। পারিবারিক কলহের কারণে মৌসুমীর মতো অবস্থা হতে পারে যেকোনো শিশুর।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক জোবায়ের মিয়া প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘শিশুরা পারিবারিক কলহ দেখে নিজেদের অনেক সময় নিরাপত্তাহীন ভাবে। মানসিকভাবে কষ্ট পায়। মৌসুমীর ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। অতীত নিয়ে কথা বললে সে নীরব থাকে। মেয়েটি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত বলে মনে হয়েছে।’ পারিবারিক কলহ বাধানোর আগে শিশুদের নিয়ে ভাবা দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিশুদের সামনে কখনোই কলহ-বিবাদ করা উচিত নয়।

মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, মৌসুমীকে বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরের বারান্দায় খুঁটির সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। যত্ন করে তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন বাবা আবদুল খালেক। খাওয়া শেষ হলে কুড়িয়ে পাওয়া একটি চাবি দিয়ে শিকলের তালা খোলার চেষ্টা করছিল মৌসুমী। কখনো চুপচাপ, কখনো আনমনা হয়ে যায়। চোখ ছল ছল করে। প্রশ্ন করলে মনোযোগ দিয়ে শোনে। তবে নির্বাক থাকে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মৌসুমীর বাবা আবদুল খালেক একসময় কারখানায় চাকরি করতেন। তবে সংসারে অভাব-অনটন ছিল। এ নিয়ে নিয়মিত ঝগড়াবিবাদ হতো স্ত্রী নার্গিস আক্তারের সঙ্গে। একপর্যায়ে নার্গিস অভিমান করে বড় মেয়েকে নিয়ে সংসার ছেড়ে চলে যান। এরপর আর কখনোই এই সংসারে স্থায়ীভাবে ফেরেননি। তবে ছোট মেয়ে মৌসুমী অসুস্থ হওয়া খবর পেয়ে প্রায়ই দেখতে এসেছেন। এমনকি মাঝেমধ্যে চিকিৎসা খরচও দিচ্ছেন।

এদিকে মেয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন বাবা আবদুল খালেক। মৌসুমীর সব দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁকেই। কারণ, বাবা ছাড়া কাউকেই সহ্য করতে পারে না সে। কর্মহীন থাকায় পরিবারে চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থা। এ অবস্থায় মৌসুমীর চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় কিছুদিন চিকিৎসা করান। তাতে মৌসুমী কিছুটা সুস্থও হয়। কিন্তু পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সে কাছে যাকে পায়, মারধর শুরু করে। জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে। কখনো সবার অজান্তে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে যায়। এ অবস্থায় তাকে এক বছর ধরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখছে পরিবার।

মৌসুমীর অবস্থা নিয়ে প্রতিবেশী একজন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লেখা ও ছবি প্রকাশ করেন। বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় সাংসদ ইকবাল হোসেনের। তিনি পরে মেয়েটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেন। গত সোমবার শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রণয় ভূষণ দাস ওই বাড়িতে যান। সাংসদের নির্দেশনায় তিনি মৌসুমীকে গাজীপুরের এক চিকিৎসককে দেখানোর ব্যবস্থা করেন। বুধবার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ওই চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়।

প্রণয় ভূষণ দাস প্রথম আলোকে বলেন, ওই চিকিৎসকের পরামর্শে মৌসুমীকে ওষুধ খাওয়ানো চলছে। চিকিৎসা বাবদ কিছু নগদ টাকা সাংসদের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে দেওয়া হয়েছে। মৌসুমির যাবতীয় চিকিৎসা খরচ সাংসদ নিজেই বহন করবেন।

Source: Prothomalo

editor

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen book. It has survived not only five centuries