পাঁচ মেয়েকে চা-রুটি খাইয়ে দিন কাটাচ্ছেন ফিলিস্তিনি নারী

নিউজ ডেস্ক:

গাজায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট আরও তীব্র হওয়ায় পাঁচ মেয়েকে সকালের নাশতায় শুধু চা আর রুটি খেতে দিতে বাধ্য হচ্ছেন হুদা আবু লায়লা। ৩০ বছর বয়সি এই ফিলিস্তিনি নারী কয়েক মাস আগেও এমন পরিস্থিতিতে পড়েননি। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে ইসরাইল গাজায় পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করায় চলতি সপ্তাহে আবারও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ইসরাইলের তিন বছরের যুদ্ধ এবং অবরোধের মধ্যে বেঁচে থাকা হুদার জন্য এমনিতেই কঠিন। অবরোধের কারণে প্রায়ই বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, আর যা পাওয়া যায়, তার দামও থাকে নাগালের বাইরে। ফলে ১৮ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি পাঁচ মেয়েকে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে।

তবে এবার বাণিজ্যিক পণ্যের ঘাটতি, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

হুদা বলেন, ‘আমরা সঙ্গে সঙ্গেই সংকটের প্রভাব টের পেয়েছি। ডিম বা দুধ কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর বেশি করে খাবার কিনে মজুত করার মতো টাকাও আমাদের নেই।’

গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে একটি তাঁবুতে মেয়েদের নিয়ে থাকেন হুদা। যুদ্ধে আহত হওয়ার পর তার স্বামী আর কাজ করতে পারেন না। অন্যের জন্য রুটি তৈরি করে সামান্য আয় করেন তিনি।

কোনো কোনো দিন পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসলার মিশ্রণ দুক্কা কিংবা জাআতার দিয়ে ক্যানজাত শিম খান। কিন্তু খাবার সহজে পাওয়া না গেলে চায়ে রুটি ডুবিয়ে খেয়েই দিন কাটাতে হয় তাদের।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ মেয়েদের স্বাস্থ্য নিয়ে। কারণ, প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে শিশুদের শারীরিক অবস্থার কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কিত হুদা।

পণ্য প্রবেশ বন্ধ, পরে চালুর ঘোষণা

গত ১৪ অক্টোবর গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। এতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়। আগে থেকেই উচ্চমূল্যের চাপে থাকা পরিবারগুলো নতুন করে সংকটে পড়ে।

ব্যবসায়ীদের প্রতি ট্রাকে ১০ হাজার ইসরাইলি শেকেল বা ৩ হাজার ২২৫ ডলার পরিশোধ করে গাজায় পণ্য প্রবেশ করানোর দাবিকে কেন্দ্র করে এ অচলাবস্থা তৈরি হয়।

গত ১৯ অক্টোবর ইসরাইল জানায়, গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ধীরে ধীরে আবার চালু করা হবে।

গাজায় ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের বিষয়টি সমন্বয়কারী ইসরাইলি সংস্থা কো-অর্ডিনেশন অব গভর্নমেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ জানায়, ব্যবসায়ীরা তাদের জানিয়েছেন, হামাস ওই অর্থ পরিশোধের দাবি প্রত্যাহার করেছে। তবে হামাসের বক্তব্য, যুদ্ধের শিকার মানুষের সহায়তায় গঠিত তহবিলে এটি ছিল স্বেচ্ছা অনুদান।

এদিকে মানবিক সহায়তাও কমে আসছে। অর্থায়নের সংকটের কারণে গাজায় খাদ্য সহায়তা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

গত ১৯ অক্টোবর সংস্থাটি জানায়, সেপ্টেম্বরে গাজায় ১৬ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও অক্টোবরে তা কমিয়ে ১১ লাখে নামানো হয়েছে।

একই সঙ্গে খাদ্য সহায়তার পরিমাণও অর্ধেক করা হয়েছে। আগে পরিবারগুলোকে দুটি খাদ্য প্যাকেট দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে একটি, সঙ্গে থাকছে গমের আটার ছোট একটি বস্তা। এ ছাড়া প্রতিদিন গরম খাবার সরবরাহের পরিমাণ আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামানো হয়েছে।

ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—সংকটাপন্ন বা তার চেয়েও গুরুতর পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছেন।

২০২৫ সালের আগস্টে গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল। একই বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফ্যাজ ক্লাসিফিকেশন জানায়, এর দুই মাস আগে গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরুর পর দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির অবনতি কিছুটা কমেছিল।

পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে হিমশিম

খাদ্যসংকটের কারণে মেয়েদের সুষম ও পুষ্টিকর খাবার দিতে পারছেন না হুদা। ডিমের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা কেনা তার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। সম্প্রতি এক দোকানি তাকে এক ট্রে ডিমের দাম ৬০ শেকেল বা ১৯ ডলার ৪০ সেন্ট বলেছেন। কিছু দোকানদার মজুত থাকা সত্ত্বেও পণ্য বিক্রি করছেন না বলেও তার মনে হয়েছে।

তাজা শাকসবজি কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণত সপ্তাহে একবার বাজারে যান হুদা। কিন্তু এখন সেখান থেকেও অল্প পরিমাণে সবজি কিনতে পারছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম প্রায় ১০ শেকেল বা ৩ ডলার ২৫ সেন্ট। টমেটোর দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ শেকেল, অর্থাৎ ৩ ডলার ২৫ সেন্ট থেকে ৪ ডলার ৮৫ সেন্ট।’

ইসরাইলের যুদ্ধ এবং গাজার অবকাঠামো ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাধার কারণে উপত্যকাটির অধিকাংশ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমেছে।

খাবারের অভাব ইতোমধ্যে হুদার মেয়েদের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তার ভাষ্য, মেয়েরা পড়াশোনা বা অন্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। প্রায়ই মাথা ঘোরা ও ক্লান্তিতে ভুগছে তারা।

বড় মেয়ে সালমার শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে তাকে গাজা সিটির আল-রানতিসি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। চিকিৎসক মেয়ের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির উন্নতি করার পরামর্শ দিয়েছেন হুদাকে।

তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরে আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দিতে না পারলে আমার মেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়বে—এ আশঙ্কা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।’

অপুষ্টির ঝুঁকিতে গাজার শিশুরা

৪০ বছর বয়সি রাইদা সোবোহের পরিবারের সদস্য ৯ জন। সন্তানদের সুস্থ রাখতে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতে না পারায় মাসের পর মাস ধরে তাদের অনেক খাবারই খাওয়া হচ্ছে না।

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বর্তমানে গাজা সিটিতে বসবাস করছেন রাইদা। বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহে সাম্প্রতিক বিঘ্নের আগেও তার পরিবার স্থানীয়ভাবে ‘তেক্কিয়া’ নামে পরিচিত কমিউনিটি রান্নাঘরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

রাইদা বলেন, ‘রান্নাঘরে খাবার থাকলে আমরা সেখান থেকে খাই।’

তার সন্তানরা সাধারণত সকালে চা পান করে। দুপুরে কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে খাবার পায়। সন্ধ্যায় কখনো ভাত, ডাল কিংবা পাস্তা খায়। কিন্তু প্রায় আট মাস ধরে তাদের খাদ্যতালিকায় দুধ, মাংস, ডিম ও পনির নেই। প্রায় এক মাস আগে শেষবার সবজি কিনেছিলেন তিনি।

রাইদা বলেন, ‘আমি ভালো মানের খাবার কিনি না। শুধু যতটুকু প্রয়োজন এবং যতটুকুর দাম দেওয়ার সামর্থ্য আছে, ততটুকুই কিনি।’

তার অভিজ্ঞতা গাজাজুড়ে শিশুদের পুষ্টি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ২ হাজার ৮০০টির বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৬০টির বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল।

ওসিএইচএর ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় প্রতি মাসে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি প্রায় ৩ হাজার শিশুকে অপুষ্টির চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

এ ছাড়া আগস্টে প্রকাশিত ইউনিসেফ-সমর্থিত একটি পুষ্টি জরিপে দেখা গেছে, গবেষকদের প্রবেশাধিকার থাকা এলাকাগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ১২ দশমিক ২ শতাংশ খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘদিনের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে এ অবস্থা দেখা দেয়।

গাজা সিটির শিশু বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ চিকিৎসক মোহাম্মদ বি আলরাই সতর্ক করে বলেছেন, গাজায় খাদ্য প্রবেশে দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধ শিশুদের অপুষ্টি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শারীরিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তার ভাষ্য, দুর্ভিক্ষের আগের পরিস্থিতির তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও হাসপাতালগুলোতে মাঝারি ও গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু আসা অব্যাহত রয়েছে। শুধু পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরাই নয়, পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সি বড় শিশুরাও এ সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।

আলরাই বলেন, কিছু শিশু গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছে এবং তাদের পা ফুলে যাচ্ছে। শরীরে মারাত্মক প্রোটিনের ঘাটতি হলে এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবার মূলত শর্করাজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভর করছে। দিনে মাত্র এক বেলা খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে তারা।

তিনি বলেন, ‘সীমান্তপথ খোলা থাকা এবং খাবার প্রবেশের সময়ও আমরা এমন রোগী দেখেছি। এক-দুই মাসে শিশুরা অপুষ্টি থেকে সেরে ওঠে না। কিছু শিশুর সুস্থ হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে অপুষ্টির রোগী আরও বাড়বে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’

দুর্বল হয়ে পড়ছে শিশুরা

রাইদার সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনেও অপুষ্টির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার ভাষ্য, শিশুরা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যায়। মাসের পর মাস পর্যাপ্ত খাবার না পেলে তাদের স্বাস্থ্যের কী হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি।

রাইদা বলেন, ‘তাদের মনে হয় সারাটা দিন ঘুমিয়েই কাটে। আমি যখন কোনো একজনকে পানির পাত্র বহন করতে বলি, সে হয়তো একবার পারে, কিন্তু দ্বিতীয়বার আর পারে না। তখন তার জন্য আমার কষ্ট হয়। নিজেকে প্রশ্ন করি—সে কি ঠিকমতো পুষ্টি পাচ্ছে? অন্য শিশুদের মতো খাবার খেতে পারছে?’

পরিবারটির নির্ভরযোগ্য কোনো আয়ের উৎস নেই বলে জানান রাইদা। তারা যে এলাকায় থাকেন, সেটি আনুষ্ঠানিক শরণার্থীশিবির হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে অন্য কিছু শিবিরের বাসিন্দারা যে সহায়তার কুপন ও স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত সামগ্রী পান, সেগুলোও তাদের ভাগ্যে জোটে না।

গাজার অনেক পরিবারের মতো রাইদাকেও যা পাওয়া যায় এবং কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তা দিয়েই সন্তানদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে।

রাইদা বলেন, ‘আমি আশা করি, কেউ আমাদের সাহায্য করবেন এবং এই কঠিন সময়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। আমি চাই, যুদ্ধ শেষ হোক, পরিস্থিতির উন্নতি হোক এবং সীমান্তপথগুলো খুলে দেওয়া হোক, যাতে খাবারের দাম কমে আসে।’

সূত্র: আল জাজিরা

দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দৈনিক আমার বাংলাদেশ