মানুষের হাসিই পারিশ্রমিক, ৩৫ বছর ধরে বিনা পয়সায় চুল কাটান আবেদ

কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি: মোঃ জাকারিয়া হোসেন

কাঁচি-চিরুনি কিংবা আধুনিক কোনো সরঞ্জাম নয়—একটি ব্লেড আর বাম হাতের বৃদ্ধাঙুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেই প্রায় ৩৫ বছর ধরে মানুষের চুল কেটে আসছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের আবেদ তেলি। তবে এই কাজের বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার প্রতীক।

আবেদ নিজেও স্বচ্ছল নন। সংসার চালাতে রয়েছে তাঁর ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফলদ গাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এসব কাজের আয়েই চলে তাঁর সংসার। এর মধ্যেও অসচ্ছল মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে চুল কাটার কাজটি ধরে রেখেছেন তিনি।

একটি শিশুকে দিয়ে শুরু

প্রায় ৩৫ বছর আগে একটি স্কুলছাত্রকে দিয়ে আবেদের এই মানবিক কাজের শুরু। তাঁর ভাষ্য, একদিন এক শিশু কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে আসে। স্কুলে শিক্ষক তার চুল ধরে টেনেছেন। কারণ জানতে চাইলে শিশুটি জানায়, টাকা না থাকায় চুল কাটাতে পারেনি।

সেদিন একটি ব্লেড এনে শিশুটির চুল কেটে দেন আবেদ। সেই শুরু, এরপর আর থামেননি।

আবেদ তেলি বলেন, “ছেলেটার বাবা-মায়ের চুল কাটানোর টাকা ছিল না। তাই সেদিন ব্লেড দিয়ে তার চুল কেটে দিই। সেই যে শুরু, আজও মানুষের চুল কেটে যাচ্ছি।”

ব্লেডেই নিখুঁত চুল কাটা

প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের চুল কাটেন আবেদ। ডান হাতে ব্লেড চালানোর সময় বাম হাতের বৃদ্ধাঙুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই পদ্ধতিতেই তিনি চুল কাটায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন।

কারও পছন্দের ধরন জানালে সেভাবেই চুল কেটে দেন। অর্থের অভাবে যারা নিয়মিত সেলুনে যেতে পারেন না, তাদের অনেকেই আবেদের কাছে চুল কাটাতে আসেন।

টাকার বদলে মানুষের হাসিই প্রাপ্তি

কেন চুল কাটার বিনিময়ে কোনো টাকা নেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে আবেদ বলেন, “অপরিষ্কার মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যায়।”

শুধু চুল কাটাই নয়, মানুষকে পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শও দেন তিনি। সময়মতো চুল ও নখ কাটার গুরুত্ব বোঝান। কারও চুল বড় ও অপরিচ্ছন্ন দেখলে নিজ থেকেই চুল কাটার কথা বলেন।

‘টাকার অভাবে উনিই শেষ ভরসা’

আবেদের কাছে নিয়মিত চুল কাটান আহসান হাবীব হাসান। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই কোনো টাকা ছাড়া আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই।”

শাহ আলম সরকার বলেন, “টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে উনিই আমার শেষ ভরসা।”

স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন, “অভাবের মধ্যেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজে এমন উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।”

কুড়িগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন বলেন, “নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবেদ তেলির মতো মানুষের এই উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।”

নিজের অভাব-অনটনকে পাশে সরিয়ে প্রায় ৩৫ বছর ধরে একটি ব্লেড হাতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আবেদ তেলি। অর্থ নয়, মানুষের পরিচ্ছন্নতা আর মুখের হাসিকেই নিজের প্রাপ্তি মনে করেন তিনি।

রাজারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের এই মানুষটি তাই শুধু চুল কাটার কারিগর নন; অসচ্ছল মানুষের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন নিঃস্বার্থ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দৈনিক আমার বাংলাদেশ