আজবগড়ের আজব রহস্য

সেই ডালিমকুমার আর কঙ্কাবতীর কথা মনে আছে তো তোমাদের? ওই যে আজবগড়ের মিনিক্ষস রোবক্ষসদের হারিয়েছিল যে দুই ভাই–বোন। এই তো বেশ মনে পড়েছে দেখছি। হ্যাঁ হ্যাঁ, আজবগড়ের আজব বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল যারা, তাদের কথাই বলছি বটে।

রোবক্ষসের হাত থেকে রেহাই পেয়ে আজবগড়ের জনগণ বেশ সুখে–শান্তিতেই দিনাতিপাত করছিল। কিন্তু হঠাৎ রাজ্যে দেখা গেল নতুন দুর্যোগ। দেশ থেকে তুলা গায়েব হয়ে যাচ্ছে। শিমুলগাছে তুলা নেই। লেপে তুলা নেই। বালিশে তুলা নেই। কেটে-ছড়ে গেলে রক্ত বন্ধ করতে যেটুকু তুলা লাগবে, সেটুকুও নেই। একদিন এক অদ্ভুত বাতাস এসে সব তুলা উড়িয়ে নিয়ে গেছে একবারে। রাজ্যে তুলার হাহাকার শুনে রাজামশায় ব্যতিব্যস্ত, কিন্তু তিনি কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় যে ভাববেন, সে উপায় নেই। তুলা ছাড়া বালিশে ঘুম আসে নাকি!

রাজামশায় তুলার সন্ধানে দিকে দিকে লোক পাঠালেন। কিন্তু চারদিকে একই অবস্থা, সব রাজ্যের সব তুলা যেন বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!

ডালিমকুমার এসব দেখে বোন কঙ্কাবতীর সঙ্গে পরামর্শ করতে এসে দেখল, বোন বিষণ্ন হয়ে বসে আছে। বিছানায় দিদির শখের টেডি বিয়ারটার খোলস পড়ে থাকতে দেখে যা বোঝার বুঝে ফেলল ডালিমকুমার। সব তুলার সঙ্গে দিদির শখের টেডি বিয়ারটার ভেতরের তুলাও গায়েব হয়ে গেছে। আর এ কারণে দিদির মন বেজায় খারাপ।

ডালিমকুমার প্রতিজ্ঞা করল, যেভাবেই হোক দিদির টেডি বিয়ারের সঙ্গে রাজ্যের সবার সব প্রিয় জিনিসের তুলা সে ফেরত আনবে। ভাবামাত্রই কাজে নেমে পড়ল ডালিমকুমার। তার মনে হলো, বাতাসে যখন তুলা টেনে নিয়ে গেছে, তখন কেউ না কেউ নিশ্চয় দেখেছে। ডালিমকুমার সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কে তুলা গায়েব হয়ে যেতে দেখেছে, সেটা জানতে চেয়ে পোস্ট দিল। ম্যাপ নিয়ে বসে গেল তাদের দেখা জায়গাগুলো মার্ক করতে। তুলা বাতাসে ভেসে কোন দিকে গেছে, একেকজনের কথা শুনে একেক জায়গায় মার্ক করতে করতে ডালিমকুমার বুঝে গেল, তুলা টেনে নেওয়া বাতাসটা গেছে উত্তরের বিশাল মানমন্দিরের দিকে।

ভাবামাত্র ডালিমকুমার তার বাইভারবাল নিয়ে রওনা দিল সেই মানমন্দিরের দিকে। এদিকে ভাইকে বাইভারবালে চড়তে দেখেই সন্দেহ হলো রাজকুমারী কঙ্কাবতীর। সে–ও ছুটল ভাইয়ের পিছু পিছু। তবে সে ছুটল গাড়িতে।

মরুঝড়, শৈত্যপ্রবাহ—এসব পাড়ি দিয়ে সবার আগে উত্তরের মানমন্দিরে এসে পৌঁছাল ডালিমকুমার। মস্ত সেই মানমন্দিরের আগাগোড়া সোনা দিয়ে মোড়া। রোদ পড়লে ঝিকিয়ে ওঠে তার গা। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে ডালিমকুমার ঢুকে পড়ে মন্দিরের ভেতর। দেখে একজন বয়স্ক মহিলা ভেতরে বসে হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে গ্রহ–নক্ষত্রের হিসাব করছে।

ডালিমকুমার তার কাছে গিয়ে শুধাল, ‘কে আপনি?’

এমন বিরান মন্দিরে হঠাৎ মানুষের আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠল সেই বয়স্ক মহিলা। হুঁশ হতেই বুকে থুতু দিল ভয়ে। ‘তুমি কে, এখানে কী করে এলে?’ পাল্টা প্রশ্ন করল মহিলা।

‘আমি আজবগড়ের রাজপুত্র, ডালিমকুমার।’

বয়স্ক মহিলা একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, ‘আমি তাঁতির মেয়ে দুখু।’

‘দুখু! এ আবার কেমন নাম?’

‘কী করব, মা–বাবা রেখেছে যে।’

‘আপনি একা একা এই মানমন্দিরে কী করেন?’

‘চাঁদের বুড়ির কাছে যাওয়ার উপায় খুঁজি।’

ডালিমকুমার চাঁদের বুড়ির কথা জানে। ইতিহাসে পড়েছে, চাঁদে যখন বসতি স্থাপিত হয়েছিল, তখন থেকেই চাঁদের বুড়ি সেখানে রয়েছে। বসতির সব লোক চলে গেলেও চাঁদের বুড়ি কেন জানি সেখানেই রয়ে গেছে। সময় কাটাতে একা একা চরকা কাটে বুড়ি।

‘কী ভাবছ? তুমি এখানে কেন, সেটা তো বললে না।’ জিজ্ঞাসা করে দুখু।

দুখুর কথায় হুঁশ হয় ডালিমকুমারের। পুরো রাজ্যের তুলা হারানোর খবর। তুলা যে বাতাসে উড়ে উড়ে এদিকেই এসেছে এবং সেটা জেনেই তার আসা। এসব কথা খুলে বলে সে দুখুকে।

সব শুনে দুখু বলল, ‘বহু বছর আগে এমন কাণ্ড আমাদের রাজ্যেও হয়েছিল। সেবার চরকা কাটার তুলা শেষ হয়ে যাওয়ায় আমাদের তুলা নিয়ে গিয়েছিল চাঁদের বুড়ি। এবারও নিশ্চয় সে–ই ঘটিয়েছে কাণ্ডটা।’

ডালিমকুমারের বিশ্বাস হয় কথাটা। এমন একটা মিথ সে বহু বছর আগে শুনেছে বা পড়েছে বলে মনে হয় তার।

‘তাহলে তুলা ফেরত আনার উপায়?’

‘চাঁদের বুড়ির কাছে গিয়ে চাইলেই বুড়ি তুলা ফেরত দিয়ে দেয়। শুধু তার কথামতো একটা পুকুরে ডুব দিয়ে উঠে আসতে হয়। ডুব দেওয়ার পর সে আমাকে সব তুলা ফেরত দিয়েছিল।’

‘চাঁদের বুড়ির কাছে গিয়ে চাইলেই বুড়ি তুলা ফেরত দিয়ে দেয়। শুধু তার কথামতো একটা পুকুরে ডুব দিয়ে উঠে আসতে হয়। ডুব দেওয়ার পর সে আমাকে সব তুলা ফেরত দিয়েছিল।’

ডালিমকুমার পড়ে ঝামেলায়। কাজটা সহজ মনে হলেও মোটেও তা সহজ নয়। যাব বললেই তো আর চাঁদে চলে যাওয়া যায় না। চাঁদ তো আর পাশের রাজ্য নয়, রীতিমতো পৃথিবীর বাইরে তার অবস্থান। সেখানে যাওয়ার জন্য দরকার হয় রকেটের। আর রকেট পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।

দুখু যেন মনের কথা বুঝতে পেরে বলল, ‘এ জন্যই আমি এখানে এতগুলো বছর আটকে আছি। রকেট না পাওয়ার জন্য চাঁদের বুড়ির কাছে যেতে পারছি না।’

এমন সময় বাইরে গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। ডালিমকুমার আর দুখু বের হয়ে দেখল, রাজকন্যা কঙ্কাবতী নামছে গাড়ি থেকে। ডালিমকুমার দিদিকে দেখে অবাক হলো ভীষণ। এরপর একা একা আসার জন্য ডালিমকুমার খেল দিদির কাছে বকা। তবে ডালিমকুমারের কাছে সব শুনে কঙ্কাবতীও মহাচিন্তায় পড়ল। রকেট তো আর পকেটে হাত দিয়ে পাওয়া যায় না। রীতিমতো বহু বছরের সাধনায় তিলে তিলে গড়ে তুলতে হয়। এখন উপায়! এ যে তীরে এসে তরি ডোবার দশা।

দুখু বলল, ‘একটা উপায় আছে।’

দুই ভাই–বোন সেটা শুনে বেশ অবাক হলো। জিজ্ঞাসা করল, ‘কী উপায়?’

দুখু তখন জানাল, এই মানমন্দির থেকে একটু দূরেই বহু বছর আগে একটা এলিয়েন শিপ নেমেছিল এক গাদা মিনিক্ষস ও রোবক্ষস নিয়ে। এলিয়েন আর রোবক্ষসরা হঠাৎ অকেজো হয়ে যাওয়ায় শিপটা এখনো থেকে গেছে পাহাড়ের ওপরে। কিন্তু এলিয়েন শিপ কী করে চালাতে হয়, সে তা জানে না। তবে দুই ভাই–বোন একবার চাইলে চেষ্টা করে দেখতে পারে।

যেই শোনা সেই কাজ। দুই ভাই–বোন বাইভারবালে চড়ে হাজির হলো সেই পাহাড়ের ওপর। দেখতে পেল, আসলেই একটা স্পেসশিপ কাত হয়ে পড়ে আছে। পা টিপে টিপে দুজনে ঢুকে গেল সেই স্পেসশিপের ভেতরে। লম্বা একটা অন্ধকার বারান্দা চলে গেছে একদম ক্যাপ্টেনস ডেক পর্যন্ত। বারান্দাটা দেখে দুজনের অন্তত তা–ই মনে হলো।

কঙ্কাবতী বলল, ‘ভাই, সামনে বুবি ট্র্যাপ থাকতে পারে। আমি আগে চেষ্টা করি।’

ডালিমকুমার আপত্তি করলেও মেনে নিল। সে জানে, বোনের চেয়ে ভালো অ্যাথলেট নয় সে। ডালিম অবশ্য বুদ্ধি খাটাল। সে বলল, ‘দিদি, তুমি যাওয়ার আগে আমরা কেন একটা ডামি পাঠাচ্ছি না? তাহলে বুবি ট্র্যাপগুলো অনায়াসে জানা যাবে।’

ভাইয়ের বুদ্ধিতে চমকিত হলো কঙ্কাবতী। ডালিমকুমার বসে গেল গতবারের অকেজো হয়ে থাকা একটা মিনিক্ষস সারিয়ে তুলতে। তাদের খুব বেশি কষ্ট করতে হলো না। মিনিক্ষসটা উঠেই হামলা করতে গিয়েছিল বটে, কিন্তু কঙ্কাবতী দ্রুত সরে যাওয়ায় তেমন বিপদ হলো না। প্রোগ্রামে রদবদল করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো সেটাকে ভেতরে। ভাই–বোন অপেক্ষা করতে লাগল কী ঘটে সেটা দেখার জন্য। লম্বা বারান্দার মধ্যে যাওয়ামাত্র একটা লেজার বিম এসে আঘাত করল সেটাকে। একদম আক্ষরিক অর্থেই পুড়ে কয়লা হয়ে গেল মিনিক্ষস। আঁতকে উঠল কঙ্কাবতী। মিনিক্ষসের জায়গায় সে–ও থাকতে পারত ওই জায়গায়। ছোট ভাইয়ের প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাল সে।

এরপর দুজনে রওনা দিল মিনিক্ষসের অনেকগুলো হাত নিয়ে। দুই ভাই–বোন মিলে একটা একটা হাত ছুড়ে দেখতে লাগল, কোথায় কোথায় লেজার বিমগুলো আঘাত হানে। যেখানে যেখানে আঘাত হানল, সেখানে সেখানে পা দিয়ে তারা পৌঁছে গেল ক্যাপ্টেনের ডেকে। এরপরের কাজ খুবই সোজা হয়ে গেল। প্রোগ্রাম বসলে স্পেসশিপটাকে জীবন্ত করে তুলতে একেবারেই কষ্ট করতে হলো না তাদের। আলোয় ভরে উঠল পুরো স্পেসশিপ। তক্ষুনি দরজায় দেখা গেল দুখুকে। হাতে উদ্যত লেজার গান।

দুখু বলল, ‘স্পেসশিপ থেকে নেমে পড়ো জলদি।’

ভাই–বোনের চোখ কপালে ওঠার দশা হলো। ডালিমকুমার মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। চাঁদের বুড়ির কথা বলার সময় যখন আপনি বলেছিলেন পুকুরে ডুব দিয়েছেন, তখনই ভুলটা খেয়াল করা উচিত ছিল। চাঁদে তো পানিই নেই, পুকুর আসবে কোথা থেকে!’

কঙ্কাবতী জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কে?’

দুখু তখন নিজের চেহারা পাল্টে হয়ে গেল একটা সবুজ এলিয়েন।

ডালিমকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনিই তাহলে সব তুলা চুরি করেছেন, যাতে কেউ এসে স্পেসশিপটা সারিয়ে তুলে আপনার বাড়ি ফেরার রাস্তা তৈরি করে দেয়?’

এলিয়েন দুখু বলল, ‘হ্যাঁ, আমি মিনিক্ষস আর রোবক্ষসদের এনেছিলাম এখানে। কিন্তু সব ডিভাইস কেউ অকেজো করে দেওয়ায় আর ফিরতে পারিনি। এই স্পেসশিপের পেছনেই আছে সব তুলা। বাতাস কাজে লাগিয়ে শুধু ওগুলোই টেনে আনতে পেরেছি। তবে একটা কথা সত্যি, আমি চাঁদের বুড়ির হয়েই এ কাজ করেছি।’ এরপর লেজার গানটা নেড়ে বলল, ‘এখন মরতে না চাইলে বিদায় হও।’

ডালিমকুমার আর কঙ্কাবতী দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কথা বলে নিল যেন। কঙ্কাবতী দুখুকে বলল, ‘আপনি একটা তথ্য জানেন না। আপনার রোবক্ষস আর মিনিক্ষসদের হারিয়েছিলাম আমরা দুই ভাই–বোন।’

ডালিমকুমার দিদির কথা শেষ হতেই হাতে তালি দিল, সঙ্গে সঙ্গে আলোয় ভরে ওঠা স্পেসশিপ আবার ডুবে গেল অন্ধকারে। আর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কঙ্কাবতী ছুটে গিয়ে মিনিক্ষসের হাতটা দিয়ে আঘাত করল একদম সবুজ এলিয়েনের মাথায়। এলিয়েন জ্ঞান হারালে আবার হাততালি দিয়ে আলো ফিরিয়ে আনল ডালিমকুমার। এরপর যা ঘটার তা–ই ঘটল। বন্দী এলিয়েন ও স্পেসশিপ নিয়ে রাজ্যে ফেরত এল দুই ভাই–বোন। উদ্ধার হলো সব তুলা। খুশির বন্যা বয়ে গেল মানুষের ভেতর। সবটা শুনে রাজ্যের সবাই রাজকন্যা আর রাজপুত্রকে মাথায় তুলে নাচতে শুরু করল। নাচবে নাই–বা কেন? তাদের জন্যই তো আজ ফিরে পেয়েছে সবার তুলা। এরপর সাত দিন সাত রাত চলল শুধু ঘুম। বালিশ পেয়ে বেঘোরে ঘুমাল রাজ্যের জনগণ। রাজামশায় অবশ্য এর নাম দিয়েছিলেন ঘুম উৎসব।

এই উৎসব ফুরোতে ফুরোতে আমিও একটু ঘুম পেড়ে নিই। ঘুম শেষে আবার গপ্প হবে।

আপাতত আমার আধুনিক রূপকথা ফুরাল নটেগাছটিও মুড়াল।

Source: Prothomalo

editor

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen book. It has survived not only five centuries