কিশোরগঞ্জে চুরির মিথ্যা অপবাদে গাছে বেঁধে কিশোরকে নিষ্ঠুর নির্যাতন !
শাহরিয়া হৃদয়,কিশোরগঞ্জ থেকেঃ মিথ্যা চুরির অপবাদ দিয়ে কিশোরগঞ্জে শাফিক নামে এক শ্রমজীবী পিতৃহীন কিশোরকে ধরে নিয়ে গাছে বেঁধে ও ঝুলিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছেু। সেই কিশোর এখন শরীরে নির্যাতনের দগদগে ক্ষত নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে তিনদিন ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।এ নিষ্ঠুর ও নির্মম ঘটনার চারদিন অতিবাহিত হলেও গ্রেফতার হয়নি কেউ।এ ঘটনায় বিচার প্রার্থী মায়ের বুকফাঁটা আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ।
চিকিৎসকরা বলছেন,রোগীর অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। পুলিশ বলছে,আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।এ ঘটনাটিকে চাঞ্জল্যকর ঘটনা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, কিশোরগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট এম এ আফজল।
জানা যায়,গত ২২ অক্টোবর আযানের পর ফজরের নামায পড়তে সমবয়সীদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদে নামাজ পড়তে বের হয় কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল কালিকাবাড়ি গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা রিনা বেগমের কিশোরপুত্র অটো রিকশা চালক শাফিক মিয়া। মসজিদের প্রবেশের আগেই রাস্তা থেকে ধরে বাড়িতে নিয়ে মিথ্যা চুরির অভিযোগ তুলে উঠানের বড়ই গাছে বেঁধে ও ঝুলিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম ছেনা দিয়ে ছ্যাকা,লাঠি দিয়ে বেধরক মারধর ও ইট দিয়ে হাত-পা খেঁেচ মধ্যযুগীয় কায়দায় তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক বর্বরোচিত নির্যাতন। এ সময় যন্ত্রনাকাতর শাফিক প্রাণভিক্ষা চেয়ে বাঁচার আকুতি জানালেও অসুররূপী ৮/৯ জন নারী পুরুষের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে মৃত্যু হয়েছে ভেবে বাড়ি থেকে কয়েকশ’ গজ দুরে একটি বাঁশঝাড় সংলগ্ন কবরস্থানের পাশে নিয়ে ফেলে রাখা হয় তাকে। সেখান থেকে মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করে এলাকাবাসী তাকে নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু; নির্যাতনকারীরা এতই প্রভাবশালী যে,একদিনের মধ্যেই প্রভাব খাটিয়ে হাসপাতাল থেকে ওই মুমুর্ষ অবস্থায় তার ভর্তি বাতিল করে বের করে দেয়া হয়। পরে স্থানীয় মানবাধিকার ও গণমাধ্যম কর্মীদের হস্তক্ষেপে পুনরায় তাকে ভর্তি করে হাসপাতাল কতৃপক্ষ।
রোববার বিকেলে কালিকাবাড়ি গ্রাম সরেজমিন পরিদর্শনকালে গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে এ নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ৯ নারী-পুরুষ বসত ঘরে তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দেয়। এসময় গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,নির্যাতনকারীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী।ওইদিন মদিনা নামের এক মহিলার কানের সোনার ফুল চুরির মিথ্যা অভিযোগ তুলে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গাছে বেঁধে নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনা দেখে নিরবে হজম করা ছাড়া প্রতিবাদ করার কারও সাহস ছিলো না।এসময় তারা দাবি করেন, শাফিক অটো-রিক্শা চালিয়ে তার স্বামী পরিত্যক্তা মাকে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।তার কোন খারাপ রেকর্ড নেই। ঘটনার দিন ফজরের নামাজ পড়তে শাফিকের সঙ্গে ঘর থেকে বের হওয়া সঙ্গী প্রতিবেশী কিশোর নাজমুল হাসান পাপন জানায়,আমরা একসঙ্গে নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় তার সামনেই তারা তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং বাড়িতে নিয়ে কানের ফুল চুরির মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার উপর বীভৎস নির্যাতন চালায়।এসময় সে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরে আশপাশের লোকজন কে জানালে তারাও ছুটে আসতে আসতে মরে গেছে ভেবে শাফিককে নিয়ে ওই জঙ্গলে ফেলে আসে। পরে খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার ফরিদ মিয়ার সহযোগীতায় অর্ধমৃত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠায়।
এ ঘটনায় শাফিকের মা রীনা বেগম বাদি হয়ে নির্যাতনকারী ৯ নারী পুরুষকে আসামি করে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা রুজু করেছেন বলে ওসি আবুশামা মোহাম্মদ ইকবাল হায়াত জানিয়েছেন।এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

