হাঁস ধরা থেকে বেলুন ফোঁটানো, ঈদে ব্যতিক্রমী আয়োজন পাকুন্দিয়ায়
নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ:
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত ও ব্যতিক্রমধর্মী করে তুলতে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাধুলার।
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় কৃষকের হাঁস ধরা, হাঁড়ি ভাঙা, ঝুড়িতে বল নিক্ষেপ ও ছোটদের বেলুন ফোঁটানো প্রতিযোগিতা।
“সম্প্রীতি পোড়াবাড়ীয়া”র আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ ব্যতিক্রমী খেলায় বিভিন্ন বয়সী দুই শতাধিক মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে কৃষকের হাঁস ধরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ৪৫ জন, ঝুড়িতে বল নিক্ষেপে ৬০ জন, হাঁড়ি ভাঙা খেলায় ৭০ জন এবং ছোটদের বেলুন ফোঁটানো খেলায় অংশ নেয় ৫০ জন শিশু-কিশোর।
বিজয়ীদের মাঝে হাঁস, লুঙ্গি ও বল উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়।
ঈদের দ্বিতীয় দিনের বিকেল থেকেই মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। শিশু-কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ ও নারীদের উপস্থিতিতে পুরো মাঠ যেন পরিণত হয় এক আনন্দমেলায়। দীর্ঘদিন পর এমন লোকজ আয়োজন দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের মাঝেও দেখা যায় বাড়তি উচ্ছ্বাস।
সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল কৃষকের হাঁস ধরা খেলায়। নির্দিষ্ট মাঠে কয়েকটি হাঁস ছেড়ে দেওয়ার পর বাঁশির শব্দে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। কেউ দৌড়ে, কেউ লাফিয়ে আবার কেউ কৌশলে হাঁস ধরার চেষ্টা করেন। হাঁসের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকে পড়ে যান, আবার কেউ কাছাকাছি গিয়েও ধরতে ব্যর্থ হন।
এমন মজার দৃশ্য দেখে দর্শকদের মাঝে হাসি-আনন্দের রোল পড়ে যায়। খেলা চলাকালে দর্শকদের করতালি, চিৎকার আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অনেকেই মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রচার করেন।
খেলা দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ূম বলেন, “ব্যাংকে চাকরি করার সুবাদে বাড়ির বাইরে বেশি থাকতে হয়। এবার এই আয়োজন আমাদের মন জয় করে নিয়েছে। ছোটবেলায় গ্রামে এমন অনেক খেলা হতো, এখন আর সেসব দেখা যায় না।”
স্থানীয় তরুণ শাহ আলম বলেন, “এখনকার ছেলেমেয়েরা মোবাইল ও ইন্টারনেট নিয়েই বেশি ব্যস্ত। এমন আয়োজন হলে সবাই আবার মাঠমুখী হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা এখলাস উদ্দিন মাসুদ বলেন, “ঢাকায় ব্যবসা করি। পরিবার নিয়ে অনেকদিন পর এত সুন্দর আয়োজন উপভোগ করলাম। গ্রামের মানুষ একসঙ্গে হলে অন্যরকম আনন্দ তৈরি হয়।”
আয়োজকদের একজন বেলাল হুসাইন বলেন, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতি ধরে রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে লোকজ খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত করতেই এ আয়োজন।
আয়োজকদের আরেকজন এস এম রায়হান বলেন, “হাঁস ধরা খেলা একসময় গ্রামবাংলার জনপ্রিয় বিনোদনের অংশ ছিল। এখন এসব প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই নতুন প্রজন্ম আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জানুক ও ভালোবাসুক।”
নারান্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুছলেহ উদ্দিন বলেন, “এ ধরনের আয়োজন সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষকে একত্রিত করার পাশাপাশি এটি সামাজিক সম্প্রীতিও বাড়ায়।”
খেলার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পুরো আয়োজন সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।
পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী আনন্দ আয়োজন। স্থানীয়দের মতে, ঈদের আনন্দকে ভিন্নমাত্রা দিতে এবং হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

