ভ্রমণের আগন্তুক

কোভিড-১৯–এর বৈশ্বিক মহামারির কারণে ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরি গত বছরের ১৪ মার্চ। এরপর থেকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি কোথাও ঘুরতে যাই না। প্রচলিত ভাষায় ট্যুর বলি আর ভ্রমণ বলি, সেটার দেখা গত ১২ থেকে ১৪ মাসে আমি পাইনি। বাসা থেকেই বের হয়েছি কেবল তিনবার!

ভ্রমণে কোথাও না যাওয়ার কারণে কী কী মিস করছি, সেটা ভাবতে বসে একগাদা কথা মাথায় এল। নতুন জায়গায় যাওয়া, ঘুরে-ফিরে দেখা, ছবি তোলা—এসব তো থাকেই। তবে হুট করে কেন যেন মাথায় এল কিছু মানুষ, আর তাদের সাময়িক সাহচর্য।

২০১৮ সালে এক সম্মেলনে অংশ নিতে জার্মানির বার্লিনে যাই। সম্মেলনের এক সেশনে ওলন্দাজ এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়। আমি বাংলাদেশি শুনে তিনি যেচে এসে বেশ আগ্রহের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন। প্রায় এক যুগ আগে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি, আগ্রহটা তাই হয়তো আরও বেশি ছিল। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, লাঞ্চের পর থাকবে কিছুক্ষণ? গল্প করতাম।

আমি সানন্দে রাজি হলাম। লাঞ্চের পরের বিরতিতে প্রায় এক ঘণ্টা আমরা বার্লিনের রাস্তায় হাঁটলাম আর আড্ডা দিলাম। উনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথাবার্তা বললেন, এ কাজেই একসময় এসেছিলেন আরকি। মুহূর্তেই বেশ আপন হয়ে গিয়েছিল পরিবেশটা। হঠাই পরিচয়, অথচ কী দারুণ কাটল সময়টা!

সেবারেই একদিন সম্মেলন শেষে একা একা বার্লিন শহরটা ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম। পথে আচমকা স্টেশনে আরেকজনের সঙ্গে দেখা। সেও ঘুরতে বেরিয়েছে। খানিক কথা হলো, অল্পস্বল্প পরিচয় হলো। ওই অল্প পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই আমরা সারা দিন একসঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছি শহরটা।

এর আগে ২০১৭ সালে একবার ২৮ থেকে ২৯ ঘণ্টার যাত্রা শেষে চেন্নাই গিয়েছিলাম, কলকাতা থেকে। দীর্ঘ এ যাত্রায় ট্রেনে আমাদের সিটের নিকটতম সহযাত্রী ছিলেন কলকাতার এক ভদ্রমহিলা। যদিও জন্ম তাঁর অন্য রাজ্যে—সম্ভবত গুজরাটে। তিনি চারটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। সাময়িক আলাপে এত আপন করে নিয়েছিলেন, বিরক্তিকর দীর্ঘ যাত্রাটা বেশ পারিবারিক আবহেই কেটে গিয়েছিল। রীতিমতো নিজের বাড়িতে দাওয়াতও দিয়েছিলেন—নিজের পরিচিতি কার্ড, ঠিকানা ইত্যাদি দিয়ে।

এমনিভাবে সিমলা যাওয়ার পথে ট্রেনে খুব স্বল্পসময়ের জন্য এক বাংলাদেশি ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। দীর্ঘ সে যাত্রা ভাগ্যের ফেরে আমরা দাঁড়িয়েই পার করি। তবে উনি এবং ওনার বন্ধুরা আমাদের পর্যায়ক্রমে বসতে দিয়েছিলেন বটে। এ রকম অভিজ্ঞতা ভাবতে বসলে আরও পাওয়া যাবে। চিন্তা করে দেখলাম, দেশের ভেতরকার ভ্রমণে সঙ্গী–সাথির সংখ্যা এত বেশি থাকে যে নতুন কারও সঙ্গে ওভাবে পরিচয় হওয়ার সৌভাগ্য হয় না। নিজেদের মধ্যে কথা বলেই কেটে যায়। একা বা অল্প কয়েকজন নিয়ে গেলেই নতুনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারটা সম্ভব হয়।

এই যে ক্ষণিকের পরিচয়, সাময়িক বন্ধুত্ব—এ ব্যাপারগুলো কী আশ্চর্য না? আমি জানি, জীবনে তাঁর সঙ্গে আমার আর কোনো দিনই দেখা হবে না। প্ল্যাটফর্মে পা রাখা মাত্র দুজন দুদিকে চলে যাব এবং কোনো দিনই আর সেই পথ এক হবে না। শুধু সাময়িকভাবে জানলাম, চিনলাম, জীবনের খাতায় দাগ কেটে গেল। আগন্তুকের মতো জীবনে পদার্পণ ঘটে এদের, সেভাবেই চলে যায়। কী অসাধারণ!

ভ্রমণের সুযোগ চলে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সেসব ক্ষণিকের সাহচর্যকে ভীষণভাবেই মিস করি…
সবশেষে আরেকটি কথা যোগ করি। দুঃখজনকভাবে সম্পর্ক ধরে রাখতে আমি খুব একটা পটু না। এই পথিকদের সঙ্গে আমার পথেই পরিচয় আর সেখানেই সমাপ্তি—কারও সঙ্গেই আমার পরে আর যোগাযোগ হয়নি। এর জন্য দায়ী আমি নিজেই, সেসব ঠিকানা আমি গুছিয়ে রাখতে পারিনি।
এ রকম কোনো পথেই দেখা মেলে আগন্তুকদের।

SOURCE : Prothomalo

%d bloggers like this: