ধর্ষণ ও হত্যার শিকার সেই নূরা জিপিএ ৫ পেয়েছে

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটী ইউনিয়নের জৈনা বাজার (আবদার) এলাকায় মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে হত্যার শিকার সাবরিনা সুলতানা নূরা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে স্থানীয় জৈনা বাজার এইচ কে একাডেমি অ্যান্ড স্কুল থেকে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল।

ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহীন সুলতানা বলেন, ‘আজ দুপুর ১টার দিকে নিহত নূরা সাবরিনার চাচা জাহিদ হাসান আরিফ ফলাফল নিতে বিদ্যালয়ে আসেন। তিনি এ সময় শিক্ষক ও অভিভাবকদের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নায় তিনি কোনো কথাও বলতে পারেননি।’

প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, ‘এই বিদ্যালয় থেকে রেজিস্ট্রেশন করার অনুমতি পাওয়া যায়নি। এটি এখনো প্রক্রিয়াধীন। পাশের  তেলিহাটী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এই বিদ্যালয়ে গত ১৫ বছর ধরে কেবল বিজ্ঞান বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা অন্য বিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে। এ বছর মোট ৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। পাসের হার শতভাগ। হত্যাকাণ্ডের শিকার নূরা সাবরিনা একজন মেধাবী ছাত্রী ছিল। এ ছাড়া অত্যন্ত বিনয়ী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিল।’

সাবরিনা সুলতানা নূরার চাচা জাহিদ হাসান আরিফ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলটি-ই আমরা পেলাম। কিন্তু যার ফলাফল কেবল সে, তার মা, ভাই-বোন কেউ নেই। এ হত্যাকাণ্ড এবং ফলাফল আমাদের পরিবারের বেঁচে থাকা প্রত্যেক সদস্যের বিষাদের স্মৃতি হয়ে থাকবে।’

গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেলে শ্রীপুর উপজেলার আবদার বাজার এলাকার প্রবাসী রেদোয়ান হোসেন কাজলের বাড়ি থেকে স্ত্রী ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক স্মৃতি আক্তার ফাতেমা (৪৫), বড় মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নূরা (১৬), ছোট মেয়ে হাওয়ারিন (১২) ও প্রতিবন্ধী ছেলে ফাদিলের (৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২২ এপ্রিল দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা চারজনকে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যার আগে মা ও বড় মেয়েকে ধর্ষণ করে তারা। রেদোয়ান হোসেন কাজল মালয়েশিয়ায় চাকরি করেন।

ওই ঘটনায় প্রবাসে অবস্থানকারী গৃহকর্তা রেদোয়ান হোসেন কাজলের বাবা আবুল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের অভিযুক্ত করে শ্রীপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) একজন ও র‌্যাব-১-এর সদস্যরা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করলে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়।

চিকিৎসক হয়ে দেশের সেবা করার স্বপ্ন ছিল নূরার :

সাবরিনা সুলতানা নূরার স্বপ্ন ছিল একজন চিকিৎসক হয়ে দেশসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। বাবা-মা ও শিক্ষকদের সহায়তায় সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছিল নূরা। পড়ালেখার প্রতিটি ধাপেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছিল সে। সবশেষ সফলতার আলো ছড়িয়েছে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী নূরা জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পর নূরার বন্ধু ও সহপাঠীরা আনন্দ উল্লাস করলেও নূরার স্বজনদের মধ্যে নেই এর ছিঁটেফোঁটাও। কারণ এই উৎসবের মধ্যমণি নূরা যে আর নেই। তাই এ ফলাফল এখন বাড়িয়েছে শুধুই আক্ষেপ।

পরিবারটির বেঁচে থাকা একমাত্র সদস্য নিহত নূরার বাবা প্রবাসী রেদোয়ান হোসেন কাজল বলেন, ‘নূরা ছোটকাল থেকেই ছিল মেধাবী। সে প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছিল। স্থানীয় এইচএকে একাডেমি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হিসেবে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়েছিল। পরীক্ষার পরই নূরা বলেছিল ভালো ফলাফল করবে। সে তার কথা রাখলেও আমাদের সমাজ বা আমরা তার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। যারা আমার মেয়ের স্বপ্নের সমাধি রচনা করে আমার পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে তাদের বিচার দেখার অপেক্ষায় দিন কাটছে এখন।’

রেদোয়ান হোসেন কাজল আরো বলেন, ‘নূরা তার স্বপ্নের পথে হেঁটে যে পরিশ্রম করত এই ফলাফল তার প্রমাণ। এই ফলাফলটাও যে আমার আক্ষেপ আরো বাড়িয়ে তুলছে।’