সরকারের প্রণোদনা: প্রেস ক্লাব ও নেতৃত্ব হতাশাজনক!

মাজহার মান্না

বিশ্বব্যাপী এক আতঙ্কের নাম করোনাভাইরাস। প্রায় প্রতিটি দেশেই হানা দিয়েছে ঘাতক এ অণুজীব। বাংলাদেশেও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। থামিয়ে দিয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। সরকারের পক্ষ থেকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ভাইরাস মোকাবেলায় ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

বদলে গেছে চিরচেনা রূপ। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহণ সেক্টরসহ সবখানে স্থবিরতা বিরাজ করছে। করোনা মোকাবেলায় প্রশাসনের পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে তাদের জন্য ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সকল সেক্টরের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীরা দিন-রাত ঝুঁকি নিয়ে জনগণকে সচেতনতা সৃষ্টিসহ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে দেশ ও জাতির উপকার করছেন।

বলা বাহুল্য বর্তমানে সাংবাদিকরা এই যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখ সারিতে থেকে মানুষকে তথ্য জানানোর দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ও মিডিয়া হাউজগুলোতে তাদের জন্য কাঙ্খিত কোনো সুযোগ মিলছে না। এটা খুবই উদ্বেগের ও হতাশার বিষয়।

অস্বীকার করার জো নেই এবারের সংকটটি সর্বব্যাপী। কমবেশি সবাই এতে আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনে বাংলাদেশে সংবাদপত্রগুলোর সার্কুলেশন ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে বেশ কয়েকটি কাগজের প্রিন্ট সংস্করণ। টেলিভিশনগুলো চলছে স্বল্পসংখ্যক কর্মী দিয়ে। অনেক দৈনিক মুদ্রণ বন্ধ করে অনলাইন ভার্সন চালু রেখেছে। খবরের কাগজগুলো কলেবরেও সংক্ষিপ্ত হয়ে ডিজিটাল সংস্করণে জোর দিয়েছে বেশি।

সব মিলে দেশের সংবাদমাধ্যমে এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এই সংকট শুধু সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারীদের সংকট নয়, গোটা শিল্পেরই সংকট। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে সেভাবেই। সঙ্গত কারণেই দাবি উঠেছে গণমাধ্যমের জন্য প্রণোদনার।

সরকার ইতোমধ্যে বিশাল অংকের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে বিভিন্ন খাতের জন্য। কিন্তু স্পষ্টভাবে সেখানে গণমাধ্যমের জন্য কিছু নেই। গণমাধ্যমও কী চায় তা স্পষ্ট নয়। কেউ চায় থোক বরাদ্দ, কেউ চায় তহবিল, কেউ চায় সহজশর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা।

যদি আমাদের সংবাদমাধ্যম সম্পর্কিত সংগঠনগুলোর নিজস্ব তহবিল থাকতো তাহলে চিন্তার কারণ ছিল না। এ দুর্দিনে নিজেরাই নিজেদের দুর্গত সহকর্মীদের সহযোগিতা করা যেতো। যেমন আইনজীবীরা করছেন। অসচ্ছল আইনজীবীদের বিনা সুদে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশন।

অপরদিকে সমাজের দর্পণ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকগণ অনেককাল আগে থেকেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়ায় সাংগঠনিকভাবে তারা এক প্লাটফর্মে আসতে পারেননি। এ অবস্থা মফস্বলের সংবাদকর্মীদের মাঝে বিরাজমান বেশি। স্পর্শকাতর এ পেশাজীবীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক থাকলেও চোখের পড়ার মতো তাদের মধ্যে ঐক্য নেই বললেই চলে। আর তাই নিজেদের কল্যাণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও কার্যত দুর্দিনে হতাশাজনক ভূমিকায় এ সংগঠন ও নেতৃত্ব!

দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের কোন্দল আর একে-অপরকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল বিরাজের ফলে সহকর্মীদের কল্যাণে প্রেস ক্লাবগুলো আজও সত্যিকারের একটি পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠেনি। এ কারণে সমাজমনস্ক সংবাদকর্মীরা থেকে যাচ্ছেন সমস্যার অতল গহ্বরে। যদিও তারা প্রত্যেহ রাষ্ট্র-সমাজের ন্যায়-অন্যায় আর অন্যের দুঃখ-দুর্দশার কথা জাতির সামনে নিজের মাধুরী মিশিয়ে উপস্থাপন করেন।

গত ১৯ এপ্রিল সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের বর্তমান দুর্দশা থেকে উত্তরণ ও পেশাগত ঝুঁকি ভাতা উল্লেখসহ বেশকিছু দাবি দাওয়া তথ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন।

একই দাবিতে গত ২১ এপ্রিল বিএফইউজে ও ডিইউজের নেতারাও তথ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে ইউনিয়নের বিভিন্ন ইউনিটের সাংবাদিকসহ সব জেলার মূল ধারার গড়ে ৩০ সংবাদকর্মী করে ৫৩ জেলায় মোট এক হাজার ৫৯০ জন, যা সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার ৭৭১ জন সাংবাদিকদের তালিকা হস্তান্তর করেছেন।

এ যাত্রায় হয়তো সরকারের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রণোদনা সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে সংবাদকর্মীদের ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের চাকরিবিধি সংক্রান্ত আইনটি না হলে এই আত্মপরিচয়ের গ্লানি দূর হবে না। কাজেই শুধু নগদের দিকে না হেঁটে পেশা ও নিজেদের মর্যাদার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

বিশ্বাস রাখতে চাই, গণমাধ্যমের জন্য সরকার যে প্রণোদনাই ঘোষণা করুন, সেটি যেন হয় দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য। এই প্রণোদনা যেন ঢাকার বাইরের মালিক, সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারী সবার জন্যই অবারিত থাকে। আর সেটিও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ প্রণোদনার আরেক অর্থ মানবিকতাও।

সবশেষে বলব, এ সংকট থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এমন দুর্যোগ ভবিষ্যতেও আসতে পারে। আর তাই পেশাগত সহকর্মী ও তাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক কল্যাণার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ ক্ষেত্রে একই দাবিতে সবাইকে উর্বর চিন্তা থেকে এক প্লাটফর্মে আসার বোধহয় এখনই মোক্ষম সময়। তাহলেই দুর্দিনে চাওয়া অধিকারের সম্মানের প্রাপ্যটুকু নিঃসংকোচে বুঝে নিতে আমরা পিছপা হবো না। এ লক্ষ্যই হোক আমাদের আজ ও আগামীর পথচলায় দৃঢ় অঙ্গীকার।

# মাজহার মান্না: সাংবাদিক-লেখক ও কর আইনজীবী, কিশোরগঞ্জ।