নিরাপদ খাদ্য ও করোনা ভাইরাস

করোনা ভাইরাস ডিজিজ (কোভিড-১৯) চলাকালীন ফুড হাইজিন কেমন হবে, শাকসবজি বা ফলমূল কীভাবে ধুলে নিরাপদ হবে, কীভাবে রান্না করতে ইত্যাদি নানান প্রশ্ন আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেককেই মাছ, মাংস, শাক-সবজি, ফল-মূল সবকিছু ডেটল পানি বা ডিটারজেন্টে ডুবিয়ে রেখে রান্না করছেন বা খাচ্ছেন। আমরা যা করছি তা আদৌ স্বাস্থ্যসম্মত বা বিজ্ঞানসম্মত? স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), ইউএস ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (FDA), ফুড স্টান্ডার্ডস ফর অস্ট্রেলিয়া এন্ড নিউজিল্যান্ড, ফুড সেইফটি অথোরিটি অব আয়ারল্যান্ড, ইউনিসেফ প্রভৃতি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কি বলে।

প্রশ্ন: করোনাভাইরাস ডিজিজ কি খাবারের মাধ্যমে বা ফুড প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালস এর মাধ্যমে ছড়াতে পারে?

উত্তর: COVID-19 ফুডবর্ন ইলনেস বা খাবারের মাধ্যমে ছড়ায় এমন রোগ নয়। এটি খাবারের মাধ্যমে বা ফুড প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়ালস এর মাধ্যমে ছড়িয়েছে এমন কোনো কেইস এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। করোনাভাইরাস খাবারের মধ্যে মাল্টিপ্লাই বা সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে না। এর জন্য মানুষ বা এনিম্যাল বডির প্রয়োজন পড়ে। তবে অন্যান্য ভাইরাসের মতো এটি সারফেস বা অবজেক্টে কিছুসময় বেঁচে থাকতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় ল্যাবরেটরি কন্ডিশনে দেখা গেছে করোনাভাইরাস প্লাস্টিক ও স্টেইনলেস স্টিলে ৭২ ঘণ্টা, কপার সারফেসে ৪ ঘণ্টা, এবং কার্ডবোর্ডে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকতে পারে।

প্রশ্ন: শাকসবজি বা ফলমূল খাবার বা রান্না করার পূর্বে ডিটারজেন্ট বা ডিসইনফেক্ট্যান্ট দিয়ে ধোয়ার প্রয়োজন আছে কি?

উত্তর: ফ্রেশ সবজি বা ফল চলমান পানিতে (চলমান ট্যাপ/টিউবওয়েলের পানিতে) ভালভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিৎ। এতে বাইরের ময়লার অধিকাংশই চলে যায়। কখনোই সাবান/ডিটারজেন্ট বা অন্য কোনো ডিজইনফেকট্যান্ট (স্যাভলন, ডেটল, হেক্সিসল), প্রভৃতি দিয়ে ফল বা সবজি ধোঁয়া উচিৎ নয়। এসব কেমিক্যাল খাওয়ার উপযুক্ত নয় এবং এতে খাবার খাওয়ার জন্য পুরোপুরি অনুপযুক্ত হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন: কোভিড-১৯ চলাকালীন মাংস খাওয়া কি নিরাপদ?

উত্তর: ধারণা করা হচ্ছে কোন প্রাণির শরীরে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। মাংস থেকে মানুষে ছড়িয়েছে এমন কোন কেইস এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মাংস ভালভাবে ধুয়ে উপযুক্ত তাপমাত্রায় রান্না করে খেতে হবে। শুধু মাংস না রান্না করে খেতে হয় এমন সব খাবারের জন্য এটা প্রযোজ্য। যেহেতু এখনো এই রোগের কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি সেহেতু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাংস খাওয়া উত্তম।

আগেই বলেছি করোনাভাইরাস ডিজিজ কোনো ফুডবর্ন ইলনেস নয়। তবুও ফুডবর্ন ইলনেস থেকে নিরাপদ থাকতে সেইফ ফুড হ্যান্ডেলিং বিষয়ে FDA প্রদত্ত গাইডলাইন অনুসরণ করা যেতে পারে।

এটি ৪ টি সহজ ধাপে বিভক্ত। ১) পরিস্কার করা/ধোয়া, ২) পৃথক করা/রাখা, ৩) রান্না করা এবং ৪) ঠান্ডা করে রেফ্রিজারেটরে/ফ্রিজে রাখা।

#পরিস্কার করা/ধোয়া:
• খাবার ধরার আগে এবং পরে গরম পানি ও সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে আপনার হাত ধুয়ে ফেলুন।
• খাবার তৈরির পর কাটিং বোর্ড, হাড়িপাতিল, বটি, চাকু ইত্যাদি গরম সাবান-পানি দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে ফেলুন।
• রান্নাঘর পরিস্কার করার জন্য পেপার টাওয়েল/টিস্যু পেপার ব্যবহার করুন। কাপড় ব্যবহার করতে চাইলে গরম কোন মাধ্যমে পরিষ্কার করে নিন।
• তাজা শাকসবজি ও ফল চলমান পানিতে ভালভাবে ধুয়ে ফেলুন। ভাল করে ধোয়ার সুবিধার্তে পরিস্কার ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন।
• ক্যানড ফুডের ক্ষেত্রে লিড খোলার আগে ভালো করে পরিস্কার করে নিন।

#পৃথকীকরণ:
• কাঁচা মাছ, মাংস, পোল্ট্রি, ডিম ইত্যাদি বাজারের ব্যাগে, শপিং কার্টে এবং রেফ্রিজারেটরে অন্যান্য খাবার থেকে আলাদা করে রাখুন।
• মাছের জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড এবং কাচা মাংস ও সি ফুডের জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করুন।
• কাচা মাছ বা মাংস রাখা হয়েছিলো এমন কোনো পাত্রে রান্না করা খাবার কখনোই রাখবেন না। রাখতে হলে পাত্রটি গরম সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

#রান্না করা:
• উপযুক্ত তাপমাত্রায় খাবার রান্না করুন। এক্ষেত্রে একটি ফুড থার্মোমিটার ব্যবহার করতে পারেন। খাবারের ভেতরের তাপমাত্রা নিম্নোক্ত স্কেলে পৌঁছলে খাবারটি নিরাপদ বলে ধরে নিতে পারেন। গরু/ছাগল/ভেড়ার মাংস: ১৪৫ °ফা. (৬৩ °সে.), গ্রাউন্ড মিট: ১৬০ °ফা. (৭১ °সে.), মুরগি/পোল্ট্রি: ১৬৫ °ফা. (৭৪ °সে.), ডিম: কুসুম ও সাদা অংশ শক্ত হওয়া না পর্যন্ত, ডিমের তরকারি: ১৬০ °ফা. (৭১ °সে.), মাছ: ১৪৫ °ফা. (৬৩ °সে.), চিংড়ি: মাংস মুক্তোর মতো অস্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত।
• মাইক্রোওভেনে রান্নার ক্ষেত্রে ঢাকনা ব্যবহার করুন। সুসম রান্নার জন্য নেড়ে নিন।
• সস, স্যুপ বা সমজাতীয় খাবার গরম করার ক্ষেত্রে বয়েল করে নিন।

#ঠান্ডা করে রেফ্রিজারেটরে/ফ্রিজে রাখা:
• রান্নার পর খাবার ঠান্ডা করে তাৎক্ষনিকভাবে রেফ্রিজারেটরে (৪-৫° সে.)/ফ্রিজে রাখুন (-১৮ °সে.)।
• মাছ, মাংস, পোল্ট্রি, সি ফুড ও অন্যান্য পচনশীল খাবার রান্না করা বা কেনার ২ ঘণ্টার মাঝে রেফ্রিজারেটর/ফ্রিজে রাখুন। বাইরের তাপমাত্রা ৩২°সে. এর বেশি হলে ১ ঘণ্টার মধ্যেই রেফ্রিজারেটর/ফ্রিজে রাখুন।
• কক্ষ তাপমাত্রায় কখনো ফ্রিজের খাবার গলাবেন না। ফ্রিজের খাবার গলানোর জন্য রেফ্রিজারেটর, ঠান্ডা পানি কিংবা মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহার করুন। পানি/মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহার করলে খাবারটি তাৎক্ষনিকভাবে রান্না করে ফেলুন।
• ফুড মেরিনেটের ক্ষেত্রে সবসময় রেফ্রিজারেটর ব্যবহার করুন।
• দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য রেফ্রিজারেটরে খাবার অগভীর পাত্রে ফাঁকা ফাঁকা করে রাখুন।

করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে স্বাস্থবিধি মেনে চলুন। নিজে ভালো থাকুন, অপরকে ভালো থাকতে দিন।