জমে উঠেছে ৪’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী কটিয়াদির ঢাকের হাট
শফিক কবীর
বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত মুর্ছনায় ও শত শত মানুষের পদচারণায় জমে উঠেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির ৪’শ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’। এখানে ঢাকিরা বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দল বেঁধে বাদ্য বাজিয়ে মনজয় করার চেষ্টা করছে বায়না নিতে আসা পূজা আয়োজকদের ।
ঢাক-ঢোলের হাটটি বৃহস্প্রতিবার (১৯ অক্টোবর) সকাল থেকে শুরু হয়েছে, চলবে শুক্রবার মহাষষ্ঠী পূজোর দিন গভীর রাত পর্যন্ত।
সনাতন ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আর সেখানে ঢাকের আওয়াজ ছাড়া পূজোর আনন্দই হবে না। সেই আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে ঢাকের আওয়াজ। ঢাক ভাড়া নিয়ে পূজোর পাঁচটি দিন পূজা মণ্ডপগুলো থাকবে উচ্ছ্বসিত।
এবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাদকরা তাদের বাদ্য যন্ত্রের পসড়া নিয়ে হাটে এসেছেন। নাচের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বাদ্য বাজিয়ে চলছে বায়না নিতে আসা পূজা আয়োজকদের মনজয় করার চেষ্টা। এই হাটে বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় না। পূজায় ধর্মীয় রীতি রেওয়াজের জন্য বাদকসহ বাদ্যযন্ত্র ভাড়া দেওয়া হয়।
কটিয়াদীর পুরান বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি বছরের মতন এবারও ঢাকীদের সরব উপস্থিতি। ঢাকার নবাবপুর, বিক্রমপুর, নারায়নগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইলসহ কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার থেকে আসা বেশিরভাগ ঢাকিরা বংশ পরম্পরায় প্রতিবছরই এ হাটে ঢাক-ঢোল নিয়ে উপস্থিত হন। শুধু ঢাক-ঢোলই নয়, এখানে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, কাঁশি, ঝনঝনিসহ নানা জাতের বাদ্যযন্ত্রও বায়না করা হয়। সাধারণত ছোট-বড় দলের ঢাকীরা দলীয় বা এককভাবে কাজ করে থাকেন। এখানে ১০/১৫ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হয়ে থাকে একেকটি ঢাকীর দল।
ঢাকার নবাবপুর থেকে আসা কৃষ্ণ বলেন, আমাদের পুর্বপুরুষেরা এখানে আসতেন, তাদের সঙ্গে আমরা আসতাম। আমরা দল বেঁধে পূজোর পাঁচদিন মণ্ডপে গান বাঁজনা করতে এ হাটে এসেছি। যাদের সঙ্গে দরদামে মিলবে তাদের মণ্ডপেই বাজনা বাজাবো।
ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে ঢাকের বায়না করতে আসা একজন বলেন, কটিয়াদীর ঢাকের হাটে প্রতিবছরই আসি। ভালো ঢাকিদের একমাত্র এ হাটেই পাওয়া যায়। পূজা বলে কথা, টাকা পয়সা কোনো সমস্যা নয়, দল ভালো চাই। এবছর প্রচুর ঢাকির দল এসেছেন এবং সবাই বেশ ভালো বাজাচ্ছে। তাই ঘুরে ঘুরে দেখছি কথা বলছি পছন্দসই একটি দলের সাথে চুক্তি করেই চলে যাবো।
ঢাকেরহাট কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার ঘোষ বলেন, প্রতি বছরই এই হাটে চার থেকে পাঁচ শতাধিক বাদকদল আসে। এবছরও আগের মতো অনেক বাদকদল হাজির হয়েছে। আমরা কমিটির পক্ষথেকে এদের থাকা-খাওয়া সহ সকল সুযোগ সুবিধাই দিয়ে থাকি। সাধারণত দক্ষ দলগুলোই এ হাটে আসে। আশা করছি, সবাই বিভিন্ন জায়গায় চুক্তি করবে। তবে যারা চুক্তিবদ্ধ হতে পারে না তাদের আমরা টাকা পয়সা দিয়ে বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।
জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দির প্রথম ভাগে রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে কটিয়াদীতে প্রথম ঢাকের হাটের সূচনা হয়। তিনি ওই সময় রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। একবার তিনি পূজার প্রয়োজনে সেরা ঢাকির সন্ধানে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠান। তখন নৌপথে বহু ঢাকি কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নেন। সেই থেকেই প্রচলন শুরু এ ঢাকের হাটের

