বিশ্বজুড়ে এআই শেয়ারে ধস, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চীন

নিউজ ডেস্ক:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এর বড় ধাক্কা লেগেছে চীনের শেয়ারবাজারে।

দেশটির প্রযুক্তি খাতের প্রধান সূচক স্টার৫০ গত ছয় মাসে প্রায় ৪০ শতাংশ দর হারিয়েছে। বিশ্বের প্রধান প্রযুক্তি সূচকগুলোর মধ্যে এটিই এখন সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স করা সূচক।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক সূচকও ২ শতাংশের বেশি কমেছে। এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে ভবিষ্যতে কতটা আয় ও মুনাফা আসবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি খাত থেকে অর্থ সরিয়ে অন্য খাতের শেয়ার ও বন্ডে বিনিয়োগ করছেন অনেকে।

চীনের জন্য পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং এআই খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে দেশটির সরকার শেয়ারবাজারকে অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু প্রযুক্তি শেয়ারের দরপতন সেই পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করছে।

ছয় মাসে স্টার৫০ সূচকের পতন ৪০ শতাংশ

ন্যাসডাকের আদলে গঠিত চীনের স্টার৫০ সূচক দেশটির প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতের গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে সূচকটি প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছিল।

চীনা কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সরকারের জোরালো সমর্থন নিয়ে আশাবাদ থেকে এই উত্থান হয়েছিল। ওই সময়ে সূচকটি দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচককেও ছাড়িয়ে যায়।

তবে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব দ্রুত বদলে যাওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ভবিষ্যতে এআই খাতে চাহিদা কতটা বাড়বে এবং কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের তুলনায় কতটা মুনাফা করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে চীনের প্রযুক্তি শেয়ারে।

স্টার৫০ সূচক ৩০ জুন সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর সময় ভবিষ্যৎ মুনাফার ৮০ গুণেরও বেশি মূল্যায়নে লেনদেন হচ্ছিল। সাম্প্রতিক দরপতনের পরও সূচকটির মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ মুনাফার ৪০ গুণের বেশি। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ১০০ সূচকের এই অনুপাত ২১ গুণ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচকের ক্ষেত্রে পাঁচ গুণেরও কম।

প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি হার্ডওয়্যার কোম্পানির শেয়ারেও বড় পতন হয়েছে। চীনের চাইনেক্সট সূচক এ সময়ে ৩৬ শতাংশ কমেছে। বড় চিপ নির্মাতা মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস সাংহাই ও মুর থ্রেডস টেকনোলজি কোম্পানির শেয়ারের মূল্যও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার বেড়েছে

চীনের শেয়ারবাজারে দরপতনের পেছনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক জেসন লিয়াও ও মারভিন চেনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চীনের প্রযুক্তি খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। পরে বিশ্বজুড়ে এআই হার্ডওয়্যার খাতের শেয়ারে বিক্রির চাপ বাড়লে চীনের অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।

হংকংয়ের সঙ্গে যুক্ত এমন একটি ট্রেডিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চীনের অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ পান। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তৃতীয় প্রান্তিকে আনুমানিক ৯০০০ কোটি ইউয়ান বা ১৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এক বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ অর্থ প্রত্যাহার। এর ফলে এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে আসা বিদেশি বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি বেরিয়ে গেছে।

দরপতনের প্রভাব পড়েছে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও। জুলাইয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া মেমোরি চিপ নির্মাতা সিএক্সএমটি করপোরেশনের শেয়ারের দাম তালিকাভুক্তির পর সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, রোবট নির্মাতা ইউশু টেকনোলজি কোম্পানির শেয়ারের দাম আগস্টে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

অর্থায়নে চ্যালেঞ্জে চীনের এআই কোম্পানিগুলো

চীনা কোম্পানিগুলো চলতি বছর দেশটির অভ্যন্তরীণ শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মোট ৩৭০০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে। ব্লুমবার্গের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ বার্ষিক তহবিল সংগ্রহ। এর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এসেছে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো থেকে।

কিন্তু শেয়ারবাজারে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে এআই কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। চীনের অনেক প্রযুক্তি কোম্পানি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহে বেশি আগ্রহী। আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহের খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়াও এর একটি কারণ।

গেভকাল ক্যাপিটালের পোর্টফোলিও ম্যানেজার লিওনিদ মিরোনভ বলেন, প্রযুক্তি খাতের শেয়ার দীর্ঘ সময় চাপের মধ্যে থাকলে চীনের এআই-সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

তার মতে, এই দুর্বলতা ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হলে তহবিল সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তা ইঙ্গিত দেবে, চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে শেয়ারবাজার প্রত্যাশিত মাত্রায় আস্থা রাখছে না।

মিরোনভ আরও বলেন, চীনের এআই কোম্পানিগুলোর অর্থায়নের প্রধান উৎস শেয়ারবাজার। দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হলে বেইজিংকে আর্থিক খাতের সংস্কার ত্বরান্বিত করতে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে রাষ্ট্র-সমর্থিত তহবিলগুলোর মাধ্যমে শেয়ার কেনার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হতে পারে।

বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কতটা

দুর্বল শেয়ারবাজারকে চাঙা করতে সরকার উদ্যোগ বাড়ালে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। বৃহস্পতিবার চীনের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বাজার স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ নিয়ে বৈঠক করেছে। এ সময় রাষ্ট্র-সমর্থিত বিনিয়োগ তহবিলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘ন্যাশনাল টিমকে’ শেয়ার কেনার গতি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনগুলোতে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে পারে। তবে সাম্প্রতিক দরপতনের পরও চীনের প্রযুক্তি শেয়ারের উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

গ্যাম ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের ফান্ড ম্যানেজার জিয়ান শি কর্টেসির মতে, বর্তমান দরপতনকে সস্তায় শেয়ার কেনার সুযোগ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। উচ্চ সম্ভাবনাময় অনেক প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম আরও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমলে তবেই আকর্ষণীয় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিশ্বজুড়ে এআই খাতের ভবিষ্যৎ আয় ও মুনাফা নিয়ে সংশয় চীনের প্রযুক্তি শেয়ারবাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন সচল রাখা এখন বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দৈনিক আমার বাংলাদেশ