সাপের ফণার সামনে সত্যি সত্যি বিন বাজানো এক সাপুড়ের গল্প

অতীত দিনের স্মৃতি নজরুলের গানের মতো। কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে। মুন্সিগঞ্জের গোয়ালীমান্দার হারুনুর রশিদ ওরফে হারুন সরদারের বয়স ৭৫ হলেও স্মৃতি ঝকঝকে। আলাপের প্রসঙ্গ ‘ফেলে আসা দিন’।

এত শত গান জীবনভর শুনলেও হারুনের প্রিয়—নায়ক আজিমের লিপসিংয়ে ‘ঝুঁটি হ্যাঁয় সারি নাগরি, ঝুটা হ্যায় সাংসার’। এ গানের বয়স ৫৬ বছর। হারুন একজীবনে এত বদল দেখেছেন যে এখন তাঁর কাছে সবই হয়তো ‘ঝুটা’ মনে হয়।

সম্প্রতি দাবদাহের মধ্যে হারুনের বাড়ির উঠোনে গাছতলায় বসে কথা হচ্ছিল। এখানে ঘরের সঙ্গে ঘর লাগোয়া বসত। গৃহস্থ মানুষের বাড়ির সঙ্গে স্পষ্টতই অনেক ফারাক। হঠাৎ দেখায় মনে হবে, এক নৌকার মুখে আরেকটির গলুই ভাসছে ঢেউয়ে। সামান্য এগোলেই পদ্মা।

জীবনের একটি পর্বে হারুন থাকতেন নৌকায় নৌকায়। নদী ধরে ধরে বহুবার গিয়েছেন বাদাবন ছাড়িয়ে। তাঁর ভাষায়, ‘ওটা সুন্দরবন না, বাদাবনই।’

হারুন যুবক বয়সে নাগরাজ সাপ খুঁজতে যেতেন জলজঙ্গলে। একসময় সাপের খেলা দেখানো ছিল তাঁর জীবিকা। পাশাপাশি সাপের বিষ সংগ্রহ, সাপ বেচাকেনার কাজও করেছেন। তাঁর পরের প্রজন্মের বাসও সাপ নিয়ে। তবে এখন সাপ ধরা আইনে নিষিদ্ধ। এ কারণে তাঁর তস্য প্রজন্মের কেউ এখন প্রবাসী, কেউ ট্যাক্সি চালান।

একসময় মুন্সিগঞ্জের গোয়ালীমান্দা অঞ্চলের সাপুড়েসরদার ছিলেন হারুন। এখন তাঁর ভাইয়ের ছেলে জিন্নাত আলী ওরফে মিস্টার হচ্ছেন ‘সরদার’। তাঁদের কোনো সংকট হলেই তাঁরা চাচার কাছে পরামর্শ নিতে আসেন।

হারুনকে তাঁর প্রিয় গান শোনানোর অনুরোধ করে হতাশ হতে হলো। এখন আর দম নেই, সুর কানে লাগে না—এমন বহু অজুহাত। কিন্তু হাতে ধরা বিনটি বাজিয়ে শোনানো যাবে কি না, জিজ্ঞাসা করতেই তিনি যে দমে শুরু করলেন, উপস্থিত সবাই বিস্মিত!

এ বাঁশি কয়েক যুগের পুরোনো। যৌবনে হারুন নিজের হাতে কাঠ চেছে, বাঁশ যুক্ত করে বানিয়েছিলেন। এখন আর এমন বিন তৈরি হয় না। তেঁতুলরঙা কাঠে নকশা খোদাই। কোথাও যেন সাপের ফণার সঙ্গে মিল আছে। আড়বাঁশির চেয়ে বহুগুণ বেশি দমে বাজাতে হয় এ বাঁশি।

সামনে বসে সাপের দুলুনির মতোই দুলে দুলে ক্লান্তিহীন বিন বাজিয়েই চলেছেন হারুন সরদার। একটানা প্রায় ২৫ মিনিট। দেখলে মনে হয়, যেন দম না নিয়েই বাজাচ্ছেন।

বিন বাজানো থামানোর পর আমাদের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে হারুন জানান, হৃৎপিণ্ডে চাপ পড়ে ভীষণ। বুক থেকে নিশ্বাস জমিয়ে তুলে ফুঁ দিতে হয়। মাঝেমধ্যে দম চুরি করতে হয়। তবে শ্রোতা যেন তা ধরতে না পারে, সে জন্য আছে কৌশল।

জীবনের সবই কৌশল। সাপ ধরাও আসলে কৌশল। বর্ষীয়ান এই সাপুড়ে বললেন, সাপের মণি, জাদুটোনো, মন্ত্রের বশ বা সিনেমায় দেখানো সাপের প্রতিশোধ—সবই মিথ্যা, কল্পনা।

মানুষ কল্পনা ভালোবাসে, তাই সাপুড়েরাও সেটাকে কাজে লাগায়। খোদ বেদেসরদারের মুখে এ কথা শুনলে একটু খটকা লাগতেই পারে। তবে প্রবীণ হারুন একটু ভিন্ন সবার চেয়ে। তাঁর অভিজ্ঞতা, বহু পরিবর্তন, অনেক মানুষ দেখার গল্প হয়তো তাঁকে এমন স্থির করেছে।

বাঁশি থামিয়ে আলাপের সময় বারবার শিশুরা উপস্থিত হলে ছন্দপতন ঘটে। তিনি এতটুকুও বিরক্ত না হয়ে প্রতিবারই ধৈর্য নিয়ে ওদের আগলে রাখতে রাখতে কথার জবাব দিচ্ছিলেন।

জানান, অনেক জায়গায় গিয়েছেন খেলা দেখাতে। কোথাও কোথাও নাম বদলাতে হয়েছে। বহু মানুষকে মিথ্যা ভয় দেখিয়ে ভড়কে দিয়েছেন। সবই ব্যবসার কৌশল। হারুন বলেন, ‘কিন্তু সাহসটা যে প্রয়োজন হয়, সে কথা অস্বীকার করতে পারবেন? সাপের ছোবলের মুখে জীবন বাজি রেখে এগোতে হয়, তার মূল্য নেই? আপনি বিনোদন নেবেন, কিন্তু আমাদের বলবেন প্রতারক, সেটা কি ঠিক?’

এসব প্রশ্ন করতে করতে ডান হাতটা এগিয়ে দিলেন হারুন, ‘এই দেখুন দাগ।’ দেখলাম, তাঁর হাতে সাপের কামড়ের দাঁত বসানোর অনেক চিহ্ন।

হারুন বললেন, ‘এই দাগের সঙ্গে আছে ভয় আর জয়ের গল্প। আমরা সাপুড়ে মানেই জীবনের ভয় নেই, তা নয়। বহুবার অতি বিষাক্ত সাপের ফণা দেখে সব ফেলে দৌড়ে পালিয়েছি। আবার কখনো ডাক শুনে সাপ ধরতে গিয়ে দেখি মাটির তলায় ১০ হাত লম্বা সাপ এতগুলা ডিম পাহারা দিচ্ছে। তখন তো ভয়ে ফেলে পালিয়ে আসিনি। মানুষের বসতবাড়ি নিরাপদ করেছি। আবার তারাই পরে আমাদের দেখে সাপুড়ে বলে দূর দূর করেছে।’

আগের চেয়ে এখন সাপ বেড়েছে বলে জানান হারুন। কিন্তু সাপ ধরা আইন করে নিষিদ্ধ আর ডিসকভারির মতো চ্যানেল হাতের মুঠোয় আসায় মানুষের বিস্ময় কমেছে। তাই এখন সাপখেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ সম্ভব নয়। তবে গোপন খবর দেওয়ার মতো করে ঝুঁকে তিনি বললেন, ‘গোপনে কিন্তু এখনো অনেকেই সাপ বিক্রি করে।’

এসব মানুষের আর কিছু করার নেই। বয়সের জন্য জীবিকাবদলের সুযোগ নেই। নাতিকে ডাকিয়ে সাপের বাক্স-ঝুড়ি আনালেন হারুন। ভেতরে নড়ছে গোখরা, দুধরাজসহ বিভিন্ন ধরনের সাপ। সরু একটি সাপ হাতে তুলে এনে বললেন, ‘শরীরটা কেমন? অন্য রকম না?’

সত্যিই ব্যতিক্রম। একটু পরপর সিঁদুররঙা দাগ যেন মেপে দেওয়া। এর নাম ‘কালনাগিন’। হারুন সরদার জানান, অনেক সাপুড়ে বিশ্বাস করেন, বেহুলার বাসরঘরে ঢোকার আগে কালনাগিনের শরীরে এই লাল দাগ ছিল না। দাগ বেহুলার সিঁদুরের। এই কালনাগিনই চাঁদ সওদাগরপুত্র লখিন্দরকে দংশন করেছিল।

এ দাগ সিঁদুর থেকে আসা—এ কথা বিশ্বাস করেন কি না, জানতে চাইলে হারুন হেসে উঠলেন। বললেন, ‘মানুষের গল্প আর কল্পনার একটা মূল্য আছে।’

হারুন সরদারের হাতের বিনটির বয়স কয়েক যুগ

হারুন সরদারের হাতের বিনটির বয়স কয়েক যুগ
ছবি: জাকারিয়া মৃধা

হারুনের কাছ থেকে উঠে আসার সময় শেষবারের মতো আবার তাঁর অনুরোধ করলাম, ‘প্রিয় গানটি শোনাবেন?’

নাছোড়বান্দার মতো গানের কথায় উল্টো হেসে হারুন জানতে চাইলেন, ‘ওই গানের দৃশ্য আপনার মনে আছে? গলায় তাবিজ, বাঁ কানে মাকড়ি ঝোলানো নায়ক আজিম লুঙ্গি পরে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছেন। নায়িকা দরজা ভাঙার চেষ্টা করছেন আর তখন ভেসে আসছে “ঝুঁটি হ্যাঁয় সারি নাগরি, ঝুটা হ্যায় সাংসার”–এর সুর?’

১৯৬৫ সালের ‘মালা’ সিনেমার স্মৃতিচারণা করতে করতে হারুন জানান, পাকিস্তান আমলে সাপ নিয়ে নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে বিন বাজিয়েছেন তাঁর চাচা সাপুড়ে রব সরদার আর তিনি। ‘বেহুলা’, ‘শুয়োরানী-দুয়োরানী’ ও ‘কাঞ্চন মালা’ ছবিতে আছে তাঁদের বিনের শব্দ। নৌকার বহরে খবর পাঠানো হতো। ঝাঁপি ও বিন নিয়ে তাঁরা পৌঁছে যেতেন শুটিংয়ে। সাপের চলচ্চিত্রের সাপগুলোও তাঁদের কাছ থেকে ভাড়ায় নেওয়া হতো। এফডিসিতে বসে বাজানো বিনের রেকর্ড রাখা হতো। আর রুপালি পর্দায় অভিনেতা সাপুড়ে বিনে শুধু ফুঁ দিয়ে দিয়ে হাত নাড়িয়ে অভিনয় করতেন।

হারুনের কথার জেরে মোবাইল ফোনে নেট সংযোগ করে দেখলাম, ৫৬ বছর আগের ‘মালা’ সিনেমা সাপুড়েদেরই গল্প।

উঠে আসার সময় এই প্রবীণ আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘বিন বাজাতাম আমরা, আর পর্দায় দেখাইত অভিনেতাদের। আমাদের কখনোই দেখেন নাই আপনারা।’

জীবিকা ও বাসস্থান পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা, সুশীল সমাজের চোখে অচ্ছুত হওয়ার অনুভবই হয়তো ‘ঝুঁটি হ্যাঁয় সারি নাগরি’ গানটিকে আরও বেশি আপন করেছে হারুনের। এ গান প্রথম শোনার সময় তিনি ছিলেন তরুণ। সে বয়সে সাপের মাথায় পা দিয়ে নাচার মতো দুর্দান্ত সাহসের অনুভব হয়তো অজান্তে মিশে আছে গানের সুরে।

পাকিস্তান আমলের অনেক চলচ্চিত্রে বিন বাজিয়েছেন হারুনুর রশিদ

পাকিস্তান আমলের অনেক চলচ্চিত্রে বিন বাজিয়েছেন  হারুনুর রশিদ

জীবনের বিপুল অভিজ্ঞতার সবটাই যেন বয়ে চলেছেন হারুন। সেই বড় নদী ধরে গিয়ে মূল দল থেকে ছোট ছোট নৌকায় ভাগ হয়ে সরু খালে ঢুকে যাওয়া। নতুন কোনো গঞ্জের পাশে বয়ে যাওয়া নদীতে সাময়িক বসত। নতুন মানুষ, নতুন পানি। যাযাবরজীবনে নিত্যনতুন জনপদে হাজারো মানুষের কত শত গল্প শুনেছেন তিনি।

সাপখেলার নামে মানুষের দুর্বার সাহসের মেলায় দর্শকের অবাক চাহনি হারুনকে আনন্দ দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। আবার তিন হাত উঁচু ফণার গর্বিত সাপকে কায়দা করে বাক্সবন্দীর কৌশল বাড়িয়েছে তাঁর আত্মবিশ্বাস। সাদা-কালো সময়ে দেখা এই ভূখণ্ডের জনপদ ও মানুষের সরল আগ্রহ সব রয়েছে তাঁর স্মৃতিতে।

হারুন সরদার জানান, সাপের সিনেমা মুক্তি পেলে অধীর হয়ে অপেক্ষা করেছেন, একবার যদি সত্যি সত্যি বিনবাদককে দেখায়।

কখনো দেখানো হয়নি। রুপালি পর্দায় সাপের ফণার সামনে বিন নিয়ে হাত-পা নাড়ানো মানুষ আসলে কখনো বিন বাজায়নি।

Source Prothomalo

editor

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen book. It has survived not only five centuries