কোয়ারেন্টিনের খাঁচা থেকে মুক্তি দেবে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

করোনাভাইরাসের তাণ্ডব এড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এর ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট। সাধারণ অর্থে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট হচ্ছে একধরনের ডকুমেন্ট। আপনি যে করোনা প্রতিরোধে কার্যকরী ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন, এটি তার প্রমাণপত্র।

নিকট ভবিষ্যতের বিশ্বে পাসপোর্টের মতোই জরুরি একটা শব্দ হতে চলেছে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

নিকট ভবিষ্যতের বিশ্বে পাসপোর্টের মতোই জরুরি একটা শব্দ হতে চলেছে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট

বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করার জন্য বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার প্রয়োজন হয়। এগুলো ছাড়া কোনো দেশের নাগরিক নিজ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে ভ্রমণ করতে পারেন না। অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সেনজেনের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে এর ব্যতিক্রম। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সেনজেনের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নাগরিক কোনো ধরনের পাসপোর্ট কিংবা ভিসা ছাড়া কেবল জাতীয় ব্যক্তিগত পরিচিতির কার্ড ব্যবহার করে ইইউ ও সেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে যাতায়াত করতে পারেন।করোনাকালে বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণের জন্য বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার পাশাপাশি করোনা নেগেটিভ সনদ ও টিকা কার্ডের প্রয়োজন হয়। তারপরও সংশ্লিষ্ট দেশে গিয়ে বা নিজ দেশে এসে ঢুকতে হয় কোয়ারেন্টিনের খাঁচায়, যা আমাদের অনেকের কাছেই কাম্য নয়। এ ছাড়া ইমিগ্রেশনের বাড়তি বিড়ম্বনা তো আছেই। সামনের দিনগুলোতে তাই বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার পাশাপাশি এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াতের শর্ত হিসেবে যুক্ত হতে পারে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট, যা কোয়ারেন্টিনের মতো ঝামেলা থেকে আমাদের সবাইকে নিষ্কৃতি দেবে। ভ্যাকসিন পাসপোর্টের ব্যবহার করে ইমিগ্রেশনের চেকপোস্টে সবধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর সরাসরি চলে যাওয়া যাবে নিজ গন্তব্যে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাকসিন পাসপোর্ট সঙ্গে থাকলে পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিটের বাইরে অন্য কোনো কাগজ দেখাতে হবে না। কোয়ারেন্টিনের জটিলতাও পোহাতে হবে না। করোনাকালে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট প্রয়োজনীয় সব ক্ষেত্রে বাড়তি সহায়ক হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে তাই বর্তমানে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট চালু করার বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন ভ্যাকসিন পাসপোর্টের নাম দিয়েছে ‘ডিজিটাল গ্রিন পাস’। ডিজিটাল গ্রিন পাস ব্যবহার করে বাধাহীনভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো দেশে যাতায়াত করা সম্ভব হবে।

শুধু বিদেশ ভ্রমণ নয়, কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্নভাবে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। যেমন: ইতালি, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি দেশে যাঁদের কাছে বৈধ গ্রিন পাস রয়েছে, কেবল তাঁদেরকেই রেস্টুরেন্টগুলোতে ডাইনিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশে জিম থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের ইনডোর ও আউটডোর অ্যাকটিভিটি কিংবা কোনো ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে হলে ভ্যাকসিন কার্ড কিংবা গ্রিন পাস সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক।কোনো কোনো শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভ্যাকসিন কার্ড বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট ছাড়া আপনাকে আপনার দেশের বাইরে ভ্রমণের জন্য অনুমতি দেওয়া হবে না। কার্যত আপনি বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। আবার অনেকে বলছেন, আগামী দিনগুলোতে ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট হয়ে উঠতে পারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।

এটাও ঠিক যে ভ্যাকসিন মানুষকে পুরোপুরিভাবে করোনার সংক্রমণ থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারে না। দুই ডোজের টিকা নেওয়ার পরও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ কারণে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের ক্ষেত্রে বিমানে ওঠার কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা আগে সব যাত্রীর কোভিড টেস্ট করাতে হয়। করোনাভাইরাস শনাক্তের ক্ষেত্রে পিসিআর টেস্টের পাশাপাশি র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টও অনেক দেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। যদিও পিসিআর টেস্টের মতো র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টও সেই অর্থে নির্ভুল নয়। এ ছাড়া টিকা গ্রহণের পর শরীরে কার্যকরী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে খানিকটা সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যেও যে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।

ভ্যাকসিনকাব্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন, ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না, সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাক—এ ছয় প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত করোনা টিকাকে জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ‘স্পুতনিক ভি’র শতকরা ৯৪ ভাগ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। এ ভ্যাকসিনও বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে জনসন অ্যান্ড জনসনের উদ্ভাবিত করোনা ভ্যাকসিনটি মাত্র এক ডোজের।

যদিও এ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা অন্যান্য ভ্যাকসিনের তুলনায় বেশ কম। কূটনৈতিক দূরত্বের কারণে পশ্চিমা অনেক দেশে এখনো চীনের তৈরি সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাক এবং রাশিয়ার তৈরি স্পুতনিক ভি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। এ কারণে যাঁরা ইউরোপ কিংবা আমেরিকা ভ্রমণ করতে চান, তাঁদের জন্য চীন ও রাশিয়ার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের পরিবর্তে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন, ফাইজার-বায়োএনটেক কিংবা মডার্নার তৈরি করোনার টিকার ওপর নির্ভর করাটা অধিক যুক্তিযুক্ত। দীর্ঘ মেয়াদে যাঁরা বিদেশে যেতে চান, তাঁদের জন্য সুযোগ থাকলে দেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে দুই ডোজ ভ্যাকসিন গ্রহণ করাটা উত্তম। কেননা, এক ডোজ টিকা শরীরে যে পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি করে, সেটি করোনা প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিসা, স্লোভেনিয়া।

Source: Prothomalo

%d bloggers like this: