ইয়াবা ও অবৈধ সোনা লুটে ৫৩ পুলিশের নাম

দুই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিয়ে ইয়াবা ও টাকা লুট করেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার তিন পুলিশ কনস্টেবল। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও ৪৬৫টি ইয়াবা আত্মসাতের চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। শেষ রক্ষা হয়নি। ৬ আগস্টে লুটের ঘটনার দুই দিনের মাথায় ধরা পড়েন। এই ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় বলা হয়, লাখ টাকা দেখে লোভ সামলাতে পারেননি। আত্মসাৎ করা ইয়াবা রেখেছিলেন বিক্রির জন্য।

শুধু ইয়াবা বিক্রি ও পাচার নয়, সোনার বার লুটসহ নানা অপরাধে ঝুঁকে পড়ছেন চট্টগ্রাম পুলিশের কিছু সদস্য। মোটা অঙ্কের টাকা আয়ের লোভে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে দুই দশকে (২০০১ থেকে ২০২১) পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে ৩৮টি। এর মধ্যে ১৯টি ইয়াবাসংক্রান্ত। এরপর সোনার বার লুটের মামলা ১০টি। এ ছাড়া টাকা লুটের ৩টি, ডাকাতি ও খুনের ২টি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ২টি এবং অস্ত্র ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আছে ২টি মামলা। মামলায় আসামি ৫৩ জন। এর মধ্যে একজন করে পুলিশ সুপার (এসপি), সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ও পরিদর্শক রয়েছেন। এ ছাড়া উপপরিদর্শক (এসআই) ২৪ জন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ৭ জন ও বাকি ১৯ জন কনস্টেবল। অপরাধে অভিযুক্ত ৪৩ জন পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম কারাগারে এক এসপিসহ সাতজন। বাকিরা জামিনে। এ পর্যন্ত তিন মামলায় সাবেক সাত পুলিশ সদস্যের সাজা হয়েছে।

পুলিশের কিছু সদস্য কেন ইয়াবা পাচারসহ নানা অপরাধে ঝুঁকছেন? ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সারা দেশে ইয়াবা পাচার হয়। ইয়াবা অনেকটাই সহজলভ্য। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিমানবন্দর হয়ে অবৈধভাবে সোনা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ধরাও পড়ে। অবৈধভাবে আসা সোনার বারগুলো লুট হলেও ক্রেতা-বিক্রেতার বৈধতা না থাকায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ফলে মোটা অঙ্কের টাকা আয়ের জন্য সহজ পথ মনে করা হয় ইয়াবা পাচার ও সোনার বার লুট।

* বর্তমানে চট্টগ্রাম কারাগারে এক এসপিসহ সাতজন। বাকিরা জামিনে। * এ পর্যন্ত তিন মামলায় সাবেক সাত পুলিশ সদস্যের সাজা হয়েছে।

ইয়াবা পাচারের যত অভিযোগ

সাতকানিয়ায় ৩ কনস্টেবল গ্রেপ্তারের আগে গত ২৭ জুন নগরের কর্ণফুলী এলাকায় ১১ হাজার ৫৬০টি ইয়াবাসহ পুলিশের এক এসআইকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। তাঁর নাম শেখ মাসুদ রানা (৩৫)। তিনি পিবিআই কক্সবাজার জেলায় কর্মরত ছিলেন।

মামলাটির তদন্ত চলছে জানিয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুলাল মাহমুদ বলেন, বেশি দামে বিক্রির জন্য কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ইয়াবাগুলো নিয়ে আসছিলেন মাসুদ।

এভাবে জেলা ও নগর মিলে ইয়াবা বিক্রি, পাচার ও আত্মসাতের মামলাসংখ্যা এখন ১৯। এর মধ্যে ১৭টি মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। প্রতিটিতে অভিযুক্ত পুলিশের জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানায় পুলিশ সূত্র।

লোভে পড়ে পুলিশ সদস্যরা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরও। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ইয়াবাসংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কোনো পুলিশ সদস্যকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। কোনো সদস্য যাতে এ পথে পা না বাড়ান, সে জন্য পুলিশের কল্যাণ সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের সতর্ক করা হচ্ছে।

আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য হয়ে অপরাধে জড়ানো গর্হিত কাজ। নিয়োগ, প্রশিক্ষণে তাঁদের নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অপরাধে জড়ালে শাস্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

মোহাম্মদ নুরুল হুদা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক

টাকা, সোনার বার লুট

আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ গ্রামে নগর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আবদুল মান্নান নামের এক ঠিকাদারকে দুই ঘণ্টা বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে মুক্তি দেওয়া হয়। ঘটনাটি ২ ফেব্রুয়ারি রাতের। এই ঘটনায় নগর পুলিশের ছয় কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছয় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পিবিআই অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করেছে। তবে এখনো জমা দেয়নি। তবে টাকা লুটের অপর দুই মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া ২৮টি সোনার বার লুটের অভিযোগের মামলায় গোয়েন্দা পুলিশের এসআই এ কে এম আবুল হোসেন, ৮টি সোনার বার লুটের ঘটনায় এনায়েত বাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মিজানুর রহমান ও কনস্টেবল খান এ আলম গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে আছেন। সোনার বার লুটের ১০ মামলা বিচারাধীন।

চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি মো. ফখরুদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দোষী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি যাতে হয়, এ জন্য রাষ্ট্রপক্ষ তৎপর রয়েছে।

তিন মামলায় সাজা

অস্ত্র মামলার আলামত একটি এলজি গায়েবের ঘটনায় নগর গোয়েন্দা পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত এসআই বি এম কামাল পাশাকে ২০১৭ সালে পাঁচ বছরের সাজা দেন আদালত। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে হাতকড়া পরিয়ে নির্যাতনের মামলায় এএসআই মুছা মিয়াকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। গত বছরের ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম গণহত্যা মামলায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। ওই তিনটি মামলায় সাজা ছাড়া দুই দশকে চট্টগ্রামে পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে হওয়া কোনো মামলার রায় হয়নি। ৩৮ মামলার মধ্যে দুটির কার্যক্রম স্থগিত। চারটি তদন্তাধীন। বাকি ৩২টি বিচারাধীন।

এ ব্যাপারে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য হয়ে অপরাধে জড়ানো গর্হিত কাজ। নিয়োগ, প্রশিক্ষণে তাঁদের নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অপরাধে জড়ালে শাস্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি এসব খারাপ কিছু সদস্যকে তদারকিতে রাখতে হবে।

Source: Prothomalo

%d bloggers like this: