সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধামোহাম্মদ ইউসুফ আর নেই

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া:  প্রবীন রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফ আর নেই (ইন্না লিল্লাহে… রাজেউন)। রোববার সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ঢাকাস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তিনি।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। চিরকুমার সাবেক এই সাংসদ দুই ভাই দুই বোনসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন।
মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফের ছোট ভাই মোহাম্মদ সেকান্দর জানান, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকাল ৮টা ২০ মিনিটে বড় ভাই ইন্তেকাল করেছেন। তবে তাকে চট্টগ্রাম নেওয়া এবং জানাজার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামীলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড.হাছান মাহমুদ এমপি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আলীশাহ সহ ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
গুরুতর অসুস্থ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউসুফকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৯ জানুয়ারি বিকেলে পুলিশ প্রহরায় অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সাবেক জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর ভাই এনডিপির প্রার্থী গিয়াস কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে এমপি হন। পরে তিনি সিপিবি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
অকৃতদ্বার মোহাম্মদ ইউসুফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ছিলনা তাঁর আর্থিক সঙ্গতি। বার্ধক্যে পৌঁছা মানুষটি নানা রোগে ভুগলেও অর্থাভাবে যথাযথ চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও দলের সাবেক একজন সংসদ সদস্য টাকার অভাবে চিকিৎসা না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় ওঠে।
এই বিষয়টা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলেন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবাইদুল কাদের ও প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নির্দেশ দেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রোববার (০৭ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন রাঙ্গুনিয়ায় মোহাম্মদ ইউসুফের গ্রামের বাড়িতে যান। তাঁকে এনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করেন। ৯ জানুয়ারি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫০ সালে রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও মা মরিয়ম বেগম। পাঁচ বছর বয়সে মা তাকে ছেড়ে পরপারে চলে যান। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সে সংসারে তার আরও দুই ভাই ও তিন বোনের ভালোবাসা তাকে সিক্ত করে। মরিয়মনগর আলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মরিয়মনগর উচ্চবিদ্যালয়ে ২ বছর শিক্ষা গ্রহণের পর ভর্তি হন রাঙ্গুনিয়া আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৬৭ বছর বয়সী ইউসুফ রাঙ্গুনিয়া কলেজে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে ইউসুফ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীদের মাঝে। দীর্ঘ সময় তিনি কলেজে ভিপি হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশকে স্বাধীন করতে রাখেন বিশেষ অবদান।
এই মুক্তিযোদ্ধার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭৩ সালে, কর্ণফুলী পাটকলে কেরানীর চাকরিতে যোগ দেওয়ার মধ্যে দিয়ে। ওই সময় থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত একটানা ২০ বছর শ্রমিক নেতা হিসেবে কাজ করেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কাজ করেন রাঙ্গুনিয়ার মানুষের কল্যাণে। রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়ন আর শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতিতে নিবেদিতপ্রাণ ইউসুফের নিজের সংসার করা হয়ে ওঠেনি। ২০০১ সালে ব্রেইন স্ট্রোক করার পর থেকেই তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৭ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ইউসুফের শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়। এরপর বিছানা থেকে নামতেও পারতেন না। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতেন।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাসিক ভাতা পান জানিয়ে তার ছোট ভাই মোহাম্মদ সেকান্দর বলেন, আমি ছোট একটা চায়ের দোকান করি। অর্থাভাবে দীর্ঘদিন ভালোমতো চিকিৎসা করাতে পারছিলাম না। পরে বিষয়টা ফেসবুক সহ বিভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে পড়লে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এতদিন ঢাকার সামররিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার উন্নতিও হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে তার অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করে। আর এখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি আজ রবিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে মারা যান।