বোরো ধান চাষে সেচ ব্যবস্থাপনা ও এডব্লিউডি পদ্ধতি-লেখা ও ছবি ঃ মোহাম্মদ নূর আলম গন্ধী

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য । আউশ, আমন বোরো মৌসুমে আমাদের দেশে ধান চাষ হলেও বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বেশী ধান চাষ হয়ে থাকে এবং ফলনও অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে বোরো মৌসুমে বেশি । ধান চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বোরো মৌসুম বৃষ্টিহীন থাকায় সেচের উপর নির্ভরশীল । আমাদের দেশে বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । তাছাড়া ধান উৎপাদনে যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন তার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি পরিমান পানি অপচয় হচ্ছে । ফলে একদিকে ফসল উৎপাদনে খরচ বাড়ছে ও অন্যদিকে দিন দিন ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে ভবিষ্যৎ চরম পানি সংকট ও সেচ ব্যবস্থাপনা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে । এর থেকে বাঁচতে সেচের পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতির ব্যবহার অতীব জরুরী ।
*ধান চাষে সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঃ জমিতে ধানের চারা রোপনের পর কম পরিমানে পানি রাখা উচিত যাতে চারা তলিয়ে না যায় । ধানের জমিতে সবসময় দাড়ানো পানি রাখার প্রয়োজন নেই তবে একটি পূর্ণমাত্রায় সেচ প্রদান করে পরবর্তী সেচ প্রদানের পূর্বে জমি দুই-তিন দিন শুকনো রাখলে ধানের ফলন কমেনা । উপরন্ত ভাবে ২৫-৩০ ভাগ পানি সাশ্রয় হয় । এ পদ্ধতিতে আগাছার পরিমান বেশি হলে আগাছা নাশক ব্যবহার করে আগাছা দমন লাভজনক হবে । ধানের জমির কাইচ থোড় আসার পূর্ব পর্যন্ত এভাবে সেচ দেওয়া যায় । তবে কাইচ থোড় আসা শুরু হলে ৫-৭ সে: মি: দাড়ানো পানি রাখা দরকার হয় । আমন ধান কাটার পর জমি পতিত না রেখে একটি বা দুটি চাষ করে রেখে দিলে বোরো মৌসুমে জমিতে ২০ ভাগ পানি কম লাগবে । কারণ পতিত জমিতে ফাটল ধরে জমি তৈরির সময় ফাটল দিয়ে প্রচুর পানির অপচয় ঘটে । উপরি সার প্রয়োগের পূর্বে জমিতে পানি কম রেখে সার প্রয়োগ করলে সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় । ধান পাকার সময় দানা শক্ত হওয়া শুরু করলে সেচ কমিয়ে পানি সেচ বন্ধ করতে হবে । এতে ধান পাকার সময় কম নেবে ও সেচের পানির অপচয় কমবে । *পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) পদ্ধতি ঃ
বোরো ধান চাষে সব সময় দাড়ানো পানি রাখা প্রয়োজন হয়না । মাটিতে প্রয়োজন মত রস থাকলেই ধান গাছ শিকড়ের মাধ্যমে তা গ্রহন করতে পারে । এ পদ্ধতিতে ধানের জমিতে প্রয়োজন মাফিক সেচ দেওয়া হয়। ফলে পানির অপচয় রোধ হয় । এর জন্য জমিতে একটি পর্যবেক্ষণ নল স্থাপন করে সেই নলের ভিতর পানির অবস্থা দেখে প্রয়োজন মাফিক সেচ দেওয়া হয় । *পর্যবেক্ষণ নল তৈরি ঃ পর্যবেক্ষণ নল হিসেবে পিভিসি পাইপ , বাঁশের চোঙ্গা অথবা প্লাষ্টিক বোতল ব্যবহার করা যাবে । নলটি লম্বায় ৩০ সেঃ মিঃ ও ব্যাস ৭-১০ সেঃ মিঃ হতে হবে। নলের নিচের দিকে ২০ সেঃমিঃ বা ৮ ইঞ্চি ছিদ্রযুক্ত এবং উপরে ১০ সেঃমিঃ বা ৪ ইঞ্চি ছিদ্রহীন থাকবে । নলের নিচের ২০সেঃমিঃ এর মধ্যে ১০ মিলিমিটার দূরে দূরে ৫ মিলিমিটির ব্যাসের ছিদ্র থাকবে। ছিদ্রগুলো সারিতে থাকবে এবং এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব থাকবে ১০ মিলিমিটার ।

*পর্যবেক্ষণ নল জমিতে স্থাপন কৌশল ঃ ধানের চারা রোপনের পূর্বে জমি ভালভাবে সমতল করতে হবে । জমিতে নলটি স্থাপনের সময় নলের ছিদ্রযুক্ত অংশের চারপাশে পাতলা কাপড় বা মিহি নেট ব্যবহার করতে হবে যাতে কাদা বা ময়লা আবর্জনায় ছিদ্র বন্ধ না হয় ও মাটির ভিতরের পানি নলের ভিতর সহজে প্রবেশ করতে পারে এবং বেরিয়ে যেতে পারে । জমিতে নলটি স্থাপনের সময় ছিদ্রযুক্ত ২০ সেঃ মিঃ বা ৮ ইঞ্চি মাটির নিচে ও ছিদ্রহীন ১০ সেঃ মিঃ বা ৪ ইঞ্চি মাটির উপরে থাকবে। ফলে সেচের পানির সাথে সংযুক্ত খড়কুটা ময়লা আবর্জনা নলে প্রবেশ করতে পারবেনা । নলটি আইলের পাশে সুবিধাযুক্ত স্থানে স্থাপন করতে হবে , যাতে উক্ত স্থানটি সমস্ত প্লটের প্রতিনিধিত্ব করে ও পর্যবেক্ষণ কাজ সহজ হয় । একটি প্লটে কমপক্ষে একটি নল স্থাপন বা দুই থেকে তিনটিও স্থাপন করা যাবে । সাধারনত ১৫ শতক জমির জন্য একটি নল স্থাপন করাই উত্তম ।

*সেচ প্রদান পদ্ধতি ঃ জমিতে ধানের চারা রোপনের ১৫ দিন পর্যন্ত ২-৪ সেঃমিঃ দাড়ানো পানি রাখতে হবে যাতে আগাছা কম জন্মে । চারা রোপনের ১৫ দিন পর থেকে উক্ত পদ্ধতি অনুসরন করে সেচ দিতে হবে । জমিতে সেচ আরম্ভ করার পর যখন জমির উপর ৫ সেঃ মিঃ দাড়নো পানি জমবে তখন সেচ প্রদান বন্ধ করতে হবে । জমির পানি শুকানোর পর নলের ভিতরে পানির মাত্রা পরিমাপ করতে হবে । পর্যবেক্ষণ নলের ভিতর পানির স্তর জমির লেবেল থেকে ১৫ সেঃ মিঃ পর্যন্ত নিচে নেমে গেলে সেচ দিতে হবে । এভাবে উক্ত পদ্ধতিতে ধান গাছের থোড় পর্যায় সময় পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সেচ চলবে । পরবর্তীতে ধান গাছে ফুল আসা থেকে দুধ স্তর পর্যন্ত পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই ৫ সেঃমিঃ দাড়ানো পানি রাখতে হবে । অতঃপর ধান কাটার দুই সপ্তাহ পূর্বে সেচ দেয়া বন্দ করতে হবে।

*এ পদ্ধতিতে সেচ প্রদান সুবিধা ঃ এ পদ্ধতিতে সেচের পানি জ্বালানি ও শ্রমিক খরচ সাশ্রয় হয় । শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ সেচের পানি সাশ্রয় হয় । ডিজেল ব্যবহার ২৯% কম হয় , ধানের ফলন ১২% বেশি হয় , পরিবেশ বান্ধব ও সর্বোপরি কম খরচে বেশি লাভ করা যায় ।