নাটোরের রুবিনা এখন সফল উদ্যোক্তা

নাটোর প্রতিনিধি :  নাটোরের হাঁস-মুরগী, মাছ আর কৃষি উদ্যান তৈরী করে সফলতা পেয়েছেন শিক্ষিত ও মার্জিত নারী উদ্যোক্তা রুবিনা। মাত্র সাড়ে চার বছরের সফলতায় মিলেছে একাধিক স্বীকৃতি। রুবিনা এখন নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কাজ করছেন। অভাব অনটনের সংসারে বাবার মৃত্যু আর বিয়ের পর নিজের সংসার ভেঙ্গে গেলেও ভেঙ্গে পড়েননি রুবাইয়া রহমান রুবিনা। নাটোর সদরের চাদপুর গ্রামে বাবার অবর্তমানে মা আর ছোট ভাই-বোনের সংসারের হাল ধরেন রুবিনা। সেলাই করে সংগৃহিত অর্থ এবং অর্থ লগ্নী প্রতিষ্ঠানের ঋণে বাড়ির আঙ্গিনায় শুরু করেন পাঁচশ’ বাচ্চা নিয়ে ব্রয়লার মুরগীর খামার। সেখানেও দূর্ভাগ্য। মুরগী বিক্রি করে মিলল লোকসান!
কিন্তু হার মানার নন রুবিনা। তাঁর ভাষায়, ব্যবসায়ের লোকসানের মধ্যে লুকিয়ে থাকে মুনাফা। নতুন উদ্যোমে শুরু করেন খামারের কার্যক্রম। শুধু মুরগীর খামারই নয়, বাড়ী সংলগ্ন নিজেদের পুকুরে শুরু করেন মাছ চাষ, সাথে তিনশ’ হাঁসের সমন্বয়ে খামার।¯œায়বিক অসুস্থ্যতা নিয়েও অফুরান জীবনী শক্তির অধিকারী রুবিনা। প্রায় একই সাথে কৃষির সাথে তাঁর অভিষেক। পর্যায়ক্রমে জমি ইজারা নিয়ে ফলের ছয়টি বাগান তৈরী করেছেন রুবিনা। এসব বাগানে ফলছে আম, লেবু, পেয়ারা, কলা,কুল আর পেঁপে; রয়েছে মরিচ। আমের তালিকায় আছে অপ্রচলিত গৌরমতি, ব্যানানা ম্যাঙ্গোর মত আম। নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার ড্রাগন ফলের ৪০টি খুঁটিতে ১২০টি ড্রাগনের প্রদর্শনী খামার স্থাপন করে দিয়েছে রুবিনাকে। ড্রাগনের বাগানে সাথী ফসল হিসেবে রুবিনা হাষ করেছেন টমেটো , কফি, সীম আর মরিচ।সকল উপকরণের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে রুবিনা প্রমাণ করেছেন-কোন কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। মুরগীর বিষ্ঠা দিয়ে তৈরী করছেন উৎকৃষ্ট জৈব সার-রিং কম্পোস্ট- প্রতি মাসে যার বিক্রয় মূল্য তিন হাজার টাকা। পাশেই উৎপাদন করছেন আরো একটি জৈব সার- ভার্মি কম্পোস্ট। কারখানার উপরে শোভা বর্ধন করছে বেগুনী রঙের সীমের ফুল। বাড়ির শোভা বাড়িয়ে রেখেছে এক ঝাঁক কবুতর। এর বাণিজ্যিক মূল্যও কম নয়।রুবিনার বিশাল এই কর্মযজ্ঞে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছেন ছোট ভাই রুবেল আর অনার্সে পড়–য়া ছোট বোন রিমি । সাথে দুইজন নিয়মিত কর্ম শ্রমিকসহ প্রতিদিন আরো গড়ে ১৫ জন করে।রুবিনার কর্মযজ্ঞের স¦ীকৃতি দিয়েছে সরকারী বিভিন্ন দপ্তর। তাদের আঙ্গিনায় আই পি এম স্কুল পরিচালনা করে এলাকার ২৫ পরিবারের ৫০ সদস্যকে হাঁস-মুরগী পালন, গরু মোটাতাজাকরণ,সব্জি চাষ, বসতবাড়ীর বাগান ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও অর্থ সহায়তা দিয়েছে নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। রুবিনার নেতৃত্বে গঠিত চাঁদপুর নারী উন্নয়ন সমবায় সমিতির ২৫ সদস্য প্রশিক্ষন শেষে প্রত্যেকেই সমবায় বিভাগ থেকে গাভী পালনের ঋণ পাচ্ছেন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। রুবিনাকে সভানেত্রী করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের নিবন্ধনে গঠিত ইয়ূথ উইম্যান ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি সেলাই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। রুবিনাকে নিয়ে কার করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সমাজ সেবা ও প্রাণী সম্পদ বিভাগ।
নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের অধীন “বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প”র আওতায় রাবিনাকে কমিউনিটি হর্টিকালচার প্রভাইডার মনোনীত করা হয়েছে। মাসে তিন হাজার টাকা সম্মানী ভাতায় কৃষিতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির কাজ করছেন রুবিনা। এলাকার আট শতাধিক ব্যক্তিকে হর্টিকালচার সেন্টারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছাড়াও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তাঁর হাতে তৈরী নারী উদ্যেক্তাদের মধ্যে সফল হয়েছেন হেনা বেগম, শাকিলাসহ বেশ কয়েকজন। হেনা বেগম বলেন, আমাদের নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে রুবিনা।নাটোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর রুবিনাকে দিয়েছে জয়িতা পদক, ইউনিলিভার “তোমার স্বপ্ন কর সত্যি” ক্যাটাগরিতে দুই লাখ টাকার প্রাইজমানী। আর সবচেয়ে সম্মানজনক হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ঢাকার খামারবাড়ীতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের আয়োজনে রাস্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এর কাছ থেকে “কৃষি উন্নয়নে নারী” পদক পেয়েছেন রুবিনা।রুবিনা বলেন, আমার পথ চলাতেই আনন্দ। আমার পথ চলা সার্থক হবে-যদি আমি সমাজের অবহেলিত নারীদের উদ্যোক্ত হিসেবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সফল হই। ইনশাল্লাহ আমি সফল হবো। নাটোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক স ম মেফতাহুল বারি বলেন, রুবিনাকে কমিউনিটি হর্টিকালচার প্রভাইডার মনোনীত করা হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তা বিশেষত: নারী উদ্যোক্তা তৈরীতে ইতোমধ্যে সে তার কাজ শুরু করেছে। বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প এর পরামর্শক এস এস কামরুজ্জামান বলেন, রুবিনার মেধা আর কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহযোগিতায় রুবিনা এখন সফল উদ্যোক্তা। সারাদেশে রুবিনার মত উদ্যোক্তা তৈরী হলে দেশ হবে সমৃদ্ধ।