বাসের ‘কিছু’ আসন ফাঁকা যাবে, দ্বিগুণ ভাড়ার ভাবনা

স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে বাসের আসন ফাঁকা রেখে এবং দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে বাস চলাচলের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামীকাল শনিবার এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারে।

আজ শুক্রবার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে কীভাবে গণপরিবহন চলাচল করতে পারে এ নিয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী নিজ বাসা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগ দেন। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।

বৈঠকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাস চলাচলের জন্য ১১টি নির্দেশনা তুলে ধরেন। তার মধ্যে একটি প্রস্তাবে তিনি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসন খালি রেখে যাত্রী পরিবহন করার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বাসের সব সিটে যাত্রী নেওয়া যাবে না। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সিট খালি রাখতে হবে। পরিবারের সদস্য হলে পাশের সিটে বসানো যাবে।’

তবে সেই বৈঠকে উপস্থিত অনেকেই অভিমত তুলে ধরে বলেন, পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মানতে হলে অর্ধেক আসনই ফাঁকা রাখা উচিত। যদিও বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সবাই আসন ফাঁকা রেখেই বাস চলানোর কথা বলেছেন।

আর যদি আসন ফাঁকা যায়, তাহলে যাত্রীদের ভাড়া বাড়ানোরও প্রস্তাব আসে বাস মালিকদের পক্ষ থেকে। তবে ভাড়া কতটুকু বাড়বে এবং কী পরিমাণ আসন ফাঁকা যাবে তা আগামীকাল বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কমিটি জানাবে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আজকের বৈঠকের শুরুতেই ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সংক্রমণকে আরো বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই সমালোচনার জবাব আমাদের দিতে হবে। আমরা অত্যন্ত দায়িত্বশীল, আমাদের পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও যাত্রীরা আগেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। এখন আমরা একটি পরীক্ষার মুখোমুখি, শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাঁর আস্থা রাখবেন।’

এ সময় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘এখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখলে ঝুঁকি বেড়ে যাবে। সেই ক্ষেত্রে দুই সিটের মধ্যে এক সিট বাদ দিতেই হবে। এ ছাড়া ভাড়া যখন বেড়ে যাবে তখন নিকট আত্মীয় চিহ্নিত করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। গ্রাম থেকে যখন একসঙ্গে আসবে তখন অনেকেই পাশাপাশি বসতে চাইবে। সে ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ হলে ঝুঁকি বেড়ে যাবে।’

বৈঠকে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মল্লিক ফখরুলও বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হলে ৫০ শতাংশ যাত্রী রাখতে হবে।’

বাস ভাড়া দ্বিগুণের ভাবনা

আলোচনার একপর্যায়ে বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণের বিষয়টিও আসে।

এ বিষয়ে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ভাড়া নির্ধারণের জন্য বিআরটিএর একটি কমিটি রয়েছে। সেই কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে যুক্তিসঙ্গত ভাড়া চূড়ান্ত করতে হবে।’

পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘যাত্রী যেহেতু অর্ধেক নেওয়া হবে সেই ক্ষেত্রে ভাড়া দ্বিগুণ করে দিলেই হলে। এটা নিয়ে কালকে আবার আলাদা বৈঠকের দরকার আছে কি?’

এ সময় অন্য বাসমালিকরাও এনায়েত উল্লাহর কথায় সায় দেন।

এ সময় সচিব বলেন, গণপরিবহন চালু করলেও যাত্রীদের ভাড়া কত হবে তার চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, শনিবার সকালে বিআরটিএ ও বাসমালিক সমিতির বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। এই প্রস্তাব আমরা নিচ্ছি, তবে সিদ্ধান্ত কাল সকালেই হবে। কারণ যেহেতু একটি কমিটি আছে, আমরা তাদের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত জানাব।’

সভা শেষে সার্বিক বিষয় নিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বৈঠকে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বাস চলাচলের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু সংখ্যক আসন ফাঁকা রেখেই বাস চলবে। এ ছাড়া ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভাড়া পুনর্নির্ধারণ কমিটি এ বিষয়ে বৈঠক করে ভাড়া ঠিক করবে। ভাড়া নিয়ে কোনো ধরনের নৈরাজ্য করা যাবে না। আগামীকাল শনিবার সবকিছু জানানো হবে।

সেতুমন্ত্রীর দেওয়া ১১ দফা নির্দেশনা হচ্ছে-

১. স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব ও শারীরিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

২. বাস টার্মিনালে কোনোভাবেই ভিড় করা যাবে না। তিন ফুট দূরত্ব বজার রেখে যাত্রীরা গাড়ির লাইনে দাঁড়াবে এবং টিকেট কাটবে।

৩. স্টেশনে হাতধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে পর্যাপ্ত।

৪. বাসে কোনো যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে পারবে না।

৫. বাসের সব সিটে যাত্রী নেওয়া যাবে না। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সিট খালি রাখতে হবে। পরিবারের সদস্য হলে পাশের সিটে বসানো যাবে।

৬. যাত্রী, চালক, সহকারী, কাউন্টারের কর্মী সবার জন্য মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক।

৭. ট্রিপের শুরু ও শেষে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ির অভ্যন্তরভাগসহ পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।

৮. যাত্রী উঠানামার সময় শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

৯. চালক ও কন্ডাক্টরদের ডিউটি একটানা দেওয়া যাবে না। তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোয়ারেন্টাইন বা রেস্ট দিতে হবে।

১০. মহাসড়কে চলাচলের জন্য পথিমধ্যে থামানো, চা বিরতি পরিহার করতে পারলে ভালো। কারণ সংক্রমণ কোথা থেকে হবে কেউই জানে না।

১১. যাত্রীদের হাতব্যাগ, মালামাল জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করতে হবে।