চীনের সামরিক হুমকির মুখে মালদ্বীপের রাজনৈতিক সঙ্কট অব্যাহত

মালদ্বীপের রাজনৈতিক সঙ্কট ২০ দিন হয়ে গেলেও এখনো সুড়ঙ্গের প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। বস্তুত, দুই পক্ষই এখন বৈরিতাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি ভারতীয় সামরিক পেশীশক্তি-সংবলিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরোক্ষ হুমকি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে চীন জানিয়েছে, পূর্ব ভারত মহাসাগরে তারা একটি নৌবহর পাঠিয়েছে।
১ ফেব্রæয়ারি সুপ্রিম কোর্টের দেয়া একটি রায়ের পর প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দলের মধ্যে সঙ্ঘাত সৃষ্টি হয়। ইয়ামিন ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। পরে এর মেয়াদ বাড়িয়েছেন।
চীনা নৌবহর
এদিকে গত সপ্তাহে মালদ্বীপের কাছে পূর্ব ভারত মহাসাগরে চীন তার নৌবহর পাঠানোর ফলে সঙ্ঘাতটি আন্তর্জাতিক রূপ নিচ্ছে। চীনা নৌবহরটি ছোট হলেও বেশ সক্ষম। এতে রয়েছে টাইপ ০৫২ডি (জিয়াঙকাই ২) নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র ডেস্ট্রয়ার। এটিকে অত্যাধুনিক রণতরী বিবেচনা করা হয়। ৭৫০০ টনি জাহাজটিতে রয়েছে ২৮০ জন ক্রু। এতে হেলিকপ্টার, স্থল-আক্রমণে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিনবিধ্বংস ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে অস্ট্রেলিয়ার একটি ওয়েবসাইটে (নিউজ.কম.এইউ) বলা হয়েছে।
বেইজিং যে ২১টিরও বেশি আধুনিক ফ্রিগেড মোতায়েন করেছে, তার মধ্যে টাইপ ০৫২ডি একটি। এটি প্রধানত বিমান প্রতিরক্ষা জোরদারে ব্যবহৃত হয়।
টাইপ ০৭১ উভচর পরিবহন ডক মানবিক ত্রাণ ও সৈন্য অবতরণের জন্য আদর্শ। এটি দুটি হেলিকপ্টার ছাড়াও নানা ধরনের উভচর অ্যাসাল্ট যান ও অবতরণ যান বহন করতে পারে। এটি হাসপাতাল ও কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সুবিধাও প্রয়োগ করতে পারে। এতে সঙ্কুলান হয় ৮০০’র মতো সৈন্য।
এটি আফ্রিকায় জলদস্যু দমনে নিয়োজিত ছিল। সা¤প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটি ভারত মহাসাগরের মাঝামাঝি এলাকায় বিচরণ করছিল।
অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অবনতি
চলতি সপ্তাহে ইয়ামিন জরুরি অবস্থার মেয়াদ ৩০ দিন বাড়িয়েছেন। ক্ষমতাসীন প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালদিভস (পিপিএম) বলেছে, তারা পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়াতে পারেন।
মধ্যস্ততার সুযোগ
দুই পক্ষই অনমনীয় অবস্থানে থাকায় বাইরে থেকে কারো মধ্যস্ততা করার সম্ভাবনা বাড়ছে। দেশটির রাজনীতি ভয়াবহ রকমের বিভক্ত হয়ে পড়ায় এই সঙ্কট নিরসন করতে পারে- এমন কোনো ব্যক্তি বা শক্তি মালদ্বীপে নেই।
আবার বাইরে শক্তি মধ্যস্ততায় এলেও সমস্যার নিরসন হবে না। সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল চাচ্ছে জাতিসংঘ বা ভারতীয় মধ্যস্ততা। আর সরকার চাচ্ছে চীনা মধ্যস্ততা। তবে সরকার বিদেশী মধ্যস্ততার পক্ষে নয়। সরকার জোর দিয়ে বলছে, মালদ্বীপের দলগুলোই বিদ্যমান সমস্যার সুরাহা করতে পারে।
মালদ্বীপের দলগুলোর মধ্যে আলোচনাও সমস্যাসঙ্কুল। সরকার চায় নিঃশর্ত আলোচনা, বিরোধী দল চায় সুপ্রিম কোর্ট যাতে খালাস দিয়েছে, আগে ওই কারাবন্দি রাজনীতিবিদদের মুক্তি দিতে হবে, বিদেশে থাকা নেতাদের দেশে ফেরার সুযোগ দিতে হবে। সরকার বলছে, তাদের রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদ ও ঘুষ গ্রহণের মতো অপরাধের কারণে তাদের আটক করা হয়েছে। ফলে মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। ইয়ামিনের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হচ্ছেজরুরি অবস্থা জারির পর থেকে ইয়ামিনের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হচ্ছে। সরকার দলবদলের জন্য ১২ এমপির সদস্যপদ বাতিল করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট তাদের পুনর্বহালের আদেশ জারি করেছিল। তারা বিরোধী দলের এমপি হলে পার্লামেন্টে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কারণে বিরোধী দল বলছে, তারাই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু সরকার বলছে, তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। ৮৫ সদস্যবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৪৩ এমপি। কিন্তু সরকারি দলের আছে ৩৮ বা ৩৯ জন।
সরকার মনে করছে, সহিংস বিক্ষোভ ঠেকাতে জরুরি আইন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। এর ফলে তারা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কিনে ফেলার কাজে জড়িত উচ্চপর্যায়ের বিরোধী দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তকাজ শেষ করতে পারবে। এর মাধ্যমে বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপও তারা প্রতিরোধ করতে পারবে বলে আশা করছে।