খালেদা জিয়ার নির্বাচন করা নিয়ে অস্পষ্টতা

নিউজ ডেস্ক : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে বিচারিক আদালত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গণে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে সেটি হলো- খালেদা জিয়া কি আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন? প্রচলিত আইন, সংবিধান এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ আদালতের কিছু তরতাজা রায় ও পর্যবেক্ষণ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ গোছের উত্তর মেলে না। যার সারমর্ম হচ্ছে- বিষয়টি আসলে অস্পষ্ট।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৯-১০ মাস আগে খালেদা জিয়ার এই দণ্ড হওয়ায় সাধারণ্যেও ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে যে, কারাবন্দি বিএনপি প্রধান কি নির্বাচন করতে পারবেন? এনিয়ে জনমনে কৌতুহলেরও অন্ত নেই। সংশ্লিষ্টরা আইন ও সংবিধানের আলোকে মোটাদাগে বলছেন, হাইকোর্ট যদি খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত বা বাতিল করেন তাহলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। হাইকোর্ট যদি দণ্ড স্থগিত না করেন এবং সেক্ষেত্রে জামিনে মুক্তি পেলেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আবার হাইকোর্ট যদি দণ্ড স্থগিত বা বাতিল করেন এবং পরবর্তীতে যদি আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে দেন তাহলেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এসবই আইন ও সংবিধানের মোটাদাগের ব্যাখা। তবে এর বাইরেও কথা আছে, বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যখন উচ্চ আদালতে যাবেন তখন আইন ও সংবিধানের পাশাপাশি কিছু দৃষ্টান্তও তারা সামনে নিয়ে আসবেন।
দুর্নীতির দায়ে বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার পরপরই আগামী নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের যোগ্যতা-অযোগ্যতা প্রশ্নে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এক্ষেত্রে দুটি রায় আছে। আপিল চূড়ান্ত পর্যায়ে না যাওয়া পর্যন্ত একটি রায় বলছে নির্বাচনে অংশ নেয়া যাবে, অন্য রায় বলছে যাবে না। এখন ওনার (খালেদা জিয়া) ব্যাপারে আপিল বিভাগ এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা তাদের বিষয়।’ ১৯৯৬ সালে আপিল বিভাগের একটি রায়ে বিচারপতি মোস্তফা কামাল বলেছিলেন, এ ধরনের অযোগ্যতার প্রশ্ন ঠিক হবে ভোটের পরে, নির্বাচনী ট্রাইবুন্যালে। রিটার্নিং অফিসার মনোনয়ন বাতিল করলেও রিট চলবে না। অন্য রায়টি দিয়েছিল হাইকোর্ট। হাইকোর্ট রায়ে বলেছিল, বিচারিক আদালতে কেউ দ্লিত হওয়ামাত্রই নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার (দণ্ড) বিষয়টি স্থগিত করার ক্ষমতা আপিল আদালতের হাতে নেই।
সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ (২ গ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, নৈতিক স্খলনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ন্যূনতম দুই বছর কারাবাসে থেকে মুক্তির পর পাঁচ বছর পার না হলে কেউ নির্বাচনে যোগ্য হবেন না।
খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, ‘নিম্ন আদালতে সাজা হলেই কেউ নির্বাচন করতে পারবেন  কি-না, বিষয়টি আসলে আমাদের আইনে স্পষ্ট নয়। নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে, এখন তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করবেন, এটা স্বাভাবিক। উচ্চ আদালত যদি নিম্ন আদালতের রায়ের উপর স্থগিতাদেশ না দেয় এবং আপিল বিচারাধীন থাকলে আইনের স্বাভাবিক হিসাব বলে-কারাগারে থেকেও তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। আর উচ্চ আদালত যদি তার আপিল খারিজ করেন তাহলে অন্য কথা। তাছাড়া উচ্চ আদালতের ইদানিং কিছু রায়ে বিষয়গুলো নিয়ে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। যেমন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সাজা হয়েছিল, হাইকোর্ট তার আপিল খারিজ করে দেয়, এরপর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ খারিজ করে নতুন করে শুনানির নির্দেশ দেয়। এর অর্থ হচ্ছে মামলাটি এখনো হাইকোর্টে বিচারাধীন। কিন্তু মায়ার মন্ত্রিত্ব কিংবা সংসদ সদস্য পদ তো যায়নি। আপিল করা অবস্থায় তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন। কাজেই এখানে মন্ত্রী মায়ার বিষয়টি একটি উদাহরণ হয়ে থাকছে। এই উদাহরণ ধরে এটা বলা যায়, উচ্চ আদালতে আপিল থাকলে কেউ নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার কথা নয়।’
শাহ্দীন মালিক বলেন, ‘নবম সংসদের সদস্য থাকা এবং যিনি বর্তমান সংসদেরও সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মামলার রায় ও এর ঘটনাপ্রবাহও আমাদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি (আওয়ামী লীগের) আবদুর রহমান বদির তিন বছর সাজা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আপিল চলমান, বাস্তবতা হচ্ছে তিনিও এমপি পদে বহাল আছেন। কাজেই নিম্ন আদালতে সাজা হলেই কোনো ব্যক্তি নির্বাচন করতে পারবেন না-বিষয়টি চূড়ান্ত নয় বলেই ধরে নেয়া যায়।’
বিশিষ্ট এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সম্পর্কে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদেও ‘হইবার’, ‘থাকিবার’ ইত্যাদি কথা বলা আছে। এখন কথা হলো সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রীদের স্বপদে বহাল থাকার যেসব উদাহরণ সবার সামনে আছে, স্বাভাবিক হিসাবে সেই সুযোগ খালেদা জিয়ারও থাকার কথা। কিন্তু এরপরও কথা থেকে যায়।’