হাওরের বুক চিরে হবে ৪ হাজার কোটির উড়াল সড়ক

মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) বেলা তখন ১২টা। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার হাওরের প্রবেশদ্বার মরিচখালি বাজারের পাশেই পরিত্যক্ত একটি স্কুলমাঠের অস্থায়ী মঞ্চে চলছিল সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে উন্নয়নকাজের অনুষ্ঠান।

মরিচখালি বাজারের এক চায়ের দোকানে তখন স্থানীয় মানুষের গ্রাম্য অধিবেশন চলছিল। চা খেতে খেতে একজন বলছিলেন, ‘এখানে সরকারি লোক আর এমপি সাহেবরা কেন আসছে।’  অন্য একজন উত্তর দিলেন, ‘কেন জানেন না! মিঠামইন উপজেলা থেকে আমাদের মরিচখালি পর্যন্ত হাওরের ওপর দিয়া সরাসরি ব্রিজ হইবো।’  পাশে থাকা আরেকজন বললেন, ‘বলেন কি এইডাও কি সম্ভব! কয় মাইল পথ, একবার চিন্তা করছেন!’  এভাবেই কথোপকথন চলছিল গ্রামের চায়ের দোকানে সাধারণ মানুষদের অধিবেশনে।

‘শুকনায় পাও, বর্ষায় নাও’ হাওরাঞ্চলের চিরচেনা এ প্রবাদটি একসময় ছিল মানুষের মুখে মুখে। বর্ষায় ডিঙি নৌকা আর শুকনোর সময় সরু কাঁচা মাটির পথ এই ছিল হাওর জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে, এখন ক্রমান্বয়ে হাওরবাসীর সুদিন ফিরছে। ভুলতে বসেছে চিরচেনা সেই প্রবাদকে।

কিশোরগঞ্জ জেলার ১ হাজার ৪৭০ বর্গকিলোমিটার হাওরাঞ্চল। যা মোট আয়তনের অর্ধেকেরও বেশি। মোট ১৩ উপজেলা নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা। এর ৯টিই হাওর অধ্যুষিত। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম এ তিন উপজেলা শতভাগ হাওরাঞ্চল। যা জেলা শহর থেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

তবে এ তিন উপজেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক সুতোয় গেঁথেছে ৩০ কিলোমিটারের একটিমাত্র অল-ওয়েদার সড়ক। ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আনুষ্ঠানিকভাবে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। ২৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ সড়কটি নির্মাণ শেষে ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর সড়কটি ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

হাওরের বিস্ময় হিসাবে খ্যাত অল-ওয়েদার এ সড়কটি চালু হওয়ার পর হাওরে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি পাল্টে যায়। পাশাপাশি দৃষ্টি কাড়ে সারা দেশের ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের। ইতিমধ্যে সারা বছরই সেটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম হচ্ছে হাওরবাসীর।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সৌন্দর্য পিপাসুদের পর্যটন ঠিকানা হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে সড়কটি। এর মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় পর্যটন সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

তবে এই চোখ জুড়ানো মন ভুলানো সড়কটি হাওরবাসীকে যোগাযোগে পূর্ণতা এনে দেয়নি। কারণ, এর সঙ্গে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর তথা সারা দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি।

এবার এ তিন উপজেলাকে সরাসরি জেলা শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করতে দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের জলরাশির বুক চিরে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উড়াল সেতু নির্মিত হতে যাচ্ছে। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকারও ওপরে। মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে শুরু হয়ে ওই উপজেলায় নির্মাণাধীন সেনানিবাস হয়ে করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালি এসে জেলা শহরে যাওয়ার মূল সড়কে সংযুক্ত হবে এ উড়াল সড়ক।

প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ। এর প্রাথমিক কাজ অনেকটা এগিয়েও গিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকার মাটি পরীক্ষার কাজও শেষ হয়েছে। এবার ভূমি অধিগ্রহণের পালা।

সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উড়াল সড়কটি নির্মাণে নকশা প্রণয়ন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য পরিকল্পনা প্রণয়নে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক অবহিতকরণ সভায় প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

করিমগঞ্জের মরিচখালি বাজারের পাশে অনুষ্ঠিত এ অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক চুন্নু।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলমের সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, সেতু বিভাগের সচিব আবু বকর ছিদ্দীক, প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদৌস এবং কিশোরগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার)।

সেতু বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) আলতাফ হোসেন শেখ এর সঞ্চালনায় সভায় প্রকল্পের সার্বিক দিক তুলে ধরেন বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক খান এম আমানত।

এতে অন্যদের মধ্যে করিমগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ, নিকলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস ভূঁইয়া জনি, করিমগঞ্জের ইউএনও মো. আবু রিয়াদ, মিঠামইন সদর ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শরীফ কামাল, গুনধর ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল সাকির নূরু সিকদার, দামপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাহের, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মোল্লা সুমন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুজিবুল হক চুন্নু এমপি বলেন, হাওর জনপদের মানুষের কাছে একসময় মেয়ে বিয়ে দিতে চাইতো না কেউ। হাওর এখন উন্নয়নের শিখরে। হাওরে উড়াল সড়ক হতে পারে এটা এক সময় স্বপ্নের মতো ছিল। উড়াল সড়ক নির্মিত হলে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর তথা সারা দেশের সঙ্গে হাওরের তিন উপজেলার স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। বক্তৃতাকালে তিনি জেলা প্রশাসককে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ হলেও উড়াল সেতুর নিচের জমিতে কৃষক যেন বোরোধান চাষ করতে পারেন, সে সুযোগ দিতে।

রাষ্ট্রপতির পুত্র রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এমপি বলেন, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ইচ্ছায় ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের মধ্যে প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হয়। ২০১৬ সালে এটির নির্মাণকাজের উদ্বোধনও করেন রাষ্ট্রপতি। হাওরবাসীর স্বপ্নের এই সড়কের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ ও সারা দেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের আগ্রহের কথা রাষ্ট্রপতিই জানিয়েছিলেন। এরপরই সেতু বিভাগ উড়াল সড়ক নির্মাণে তৎপর হয়।

উড়াল সেতুটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়নে সরকারের উচ্চপর্যায়ের তাগিদ রয়েছে, এমন তথ্য দিয়ে সেতু বিভাগের সচিব আবু বকর ছিদ্দীক বলেন, মিঠামইন থেকে করিমগঞ্জের মরিচখালি পর্যন্ত মূল উড়াল সেতুটি হবে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের। প্রকল্পের অধীনে মরিচখালি থেকে কিশোরগঞ্জ সদরের নাকভাঙ্গা পর্যন্ত সড়কটিও প্রশস্ত করা হবে। প্রকল্পটির নির্মাণে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ হবে। পুরো টাকা সরকারের রাজস্ব খাত থেকে ব্যয় করা হবে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক খান এম আমানত বলেন, এর আগে হাওরে যেভাবে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব আছে। এ জন্যই হাওরে উড়াল সড়ক করা হচ্ছে। এতে পানির প্রবাহ ঠিক থাকবে। জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলবে না। উড়াল সড়কটি নির্মাণে হাওরের জনজীবনের মান উন্নত হবে বলেও জানান তিনি।

দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দৈনিক আমার বাংলাদেশ

%d bloggers like this: