খোদেজা বেগমের দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রা: ‘রাতে নৌকার ছাদে জানাজা পড়ে লাশ ফেলা হতো সাগরে’

খোদেজা বেগমের সমুদ্রযাত্রার কাহিনী পুরোনো দিনের দস্যুজাহাজের ভয়ংকর অভিযানকেও যেন হার মানায়। যে নৌকায় তারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার উপকূল পর্যন্ত, সেটি একের পর এক ভয়ংকর সব ঘটনার শিকার হয়েছে। পথে তারা ঝড়ের কবলে পড়েছেন। নানান দেশের উপকূলরক্ষীরা তাদের তাড়া করেছে। খাবার আর পানির অভাবে প্রতিদিন মানুষ মরেছে নৌকায়। তাদের লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে সাগরে।

নৌকার বার্মিজ নাবিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন রোহিঙ্গারা। সেখানে ধর্ষণ, খুন-খারাবির মতো ঘটনা ঘটেছে। ৫৪ দিন সাগরে ভেসে অবশেষে উপকূলে ফিরেছেন তারা। বাংলাদেশের টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবির থেকে টেলিফোনে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে খোদেজা বেগম তার এই ভয়ংকর সমূদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন বিবিসি বাংলাকে:

“মেয়েটার নাম আমার মনে নেই। তবে তার কোন অসুখ ছিল না। আমাদের নৌকায় খাবার পানি ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাই ও সাগরের নোনা পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। আমার সামনে ও মারা যাচ্ছিল। আমি এই ঘটনাটা ভুলতে পারি না। ওর ছিল চারটা ছেলে-মেয়ে। মা মরা ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখে আমার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছিল।”

খোদেজা বেগম ঠিক মনে করতে পারেন না, ঠিক কত তারিখে, কোথায় এই ঘটনা ঘটেছিল। কারণ প্রায় দুমাস ধরে যখন একটা বড় নৌকায় পাঁচশোর বেশি মানুষকে সাগরে প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হচ্ছিল, তখন তারা স্থান-কাল-দিন-তারিখের হিসেব হারিয়ে ফেলেছিলেন।

তিনি শুধু মনে করতে পারেন, এটি ঘটেছিল মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে তারা ফিরে আসার পথে। নৌকার দোতলায় যে অংশটিতে মেয়েদের রাখা হয়েছিল সেখানে মেয়েটির তখন একেবারে শেষ অবস্থা। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। আর আবোল-তাবোল বকছিল।

“নৌকার যে জায়গায় আমরা বসে ছিলাম, সেখানে পা সোজা করার উপায় পর্যন্ত নেই। গাদাগাদি করে বসে আমরা সবাই। প্রচন্ড গরম। আমি জানতাম এরপর মেয়েটার ভাগ্যে কী ঘটবে।”

খোদেজা বেগমের ছেলে নুরুল ইসলামের কাজ ছিল নৌকায় মারা যাওয়া লোকজনের জানাজা পড়া। কেউ মারা গেলে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হতো একদম উপরে। সেখানে জানাজা পড়ানো হতো। তারপর লাশ ফেলে দেয়া হতো সাগরে।

“মারা যাওয়ার পর লাশ নৌকার একদম উপরে নিয়ে গেল ওরা। ছেলে-মেয়েগুলোকে ওরা নিয়ে গেল নৌকার অপর পাশে। বড় মেয়েটির বয়স হবে ১৫/১৬, নাম শওকত আরা। পরেরগুলো একদম ছোট। ওদের হাতে বিস্কুট ধরিয়ে দিয়েছিল। আর অন্যদিকে তখন ওদের মায়ের লাশ ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছিল সাগরে।”

দুই মাস ধরে সাগরে ভেসে বেড়ানোর সময় এরকম আরও বহু মৃত্যু দেখেছেন খোদেজা বেগম। ভাগ্যক্রমে নিজে বেঁচে গেছেন, প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন টেকনাফের শরণার্থী শিবিরের পুরোনো ঠিকানায়, কিন্তু নৌকায় স্বচক্ষে দেখা এসব মৃত্যুর ঘটনা এখনো তাকে তাড়া করছে।

“আমাদের নৌকায় কত মানুষ মারা গিয়েছিল কেউ জানেনা। কেউ বলছে ৫০ জন কেউ বলছে ৭০ জন। তবে আমি জানি অন্তত ১৬/১৮ জন মহিলা মারা গেছে। আর পুরুষ মারা গেছে তার চেয়ে বেশি,” বলছিলেন তিনি।

রহস্যময় নৌকা:

১৪ ই এপ্রিল রাতে টেকনাফের সাগর তীরে এক রহস্যজনক নৌকা এসে ভিড়লো। সেই নৌকায় শত শত মানুষ। বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা এতটাই মুমূর্ষু যে, তাদের উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই।

কমান্ডার সোহেল রানা টেকনাফে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের অধিনায়ক। ১৪ ই এপ্রিল রাতেই তাদের কাছে এই নৌকার খবর এসে পৌঁছায়। সকালে সেখানে গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা অবর্ণনীয়।

‘অন্তত দশজনকে আমি পেয়েছে, তাদের মনে হচ্ছিল যেন মৃতপ্রায়। অনাহারে, পানির অভাবে এদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। দুর্ভিক্ষের শিকার হওয়া কংকালসার মানুষের যে ছবি আমরা দেখি, এদের অবস্থা ছিল সেরকম। অনেকেই নানা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত।”

নৌকার আরোহীদের সবাই রোহিঙ্গা শরণার্থী। থাকতেন কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। এরা মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। তখন তাদের নিয়ে নৌকাটি ঘুরে বেড়াচ্ছিল সাগরে। নৌকার বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো তাদের সাগরযাত্রার যে কাহিনী জানালেন, তা শিউরে উঠার মত।

“আমরা ওদের সবার সঙ্গে কথা বলে অনেক হিসেব করে যেটা বুঝতে পারছি এই নৌকাটি অন্তত ৫৪ দিন সাগরে ছিল। এরা দুইবার মালয়েশিয়ায় পর্যন্ত গিয়ে সেখানে নামার চেষ্টা করেছে। পথে তাদের খাবার আর পানি ফুরিয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের কোস্ট গার্ড আর নৌবাহিনী তাদের তাড়া করেছে। নৌকায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বার্মিজ ক্রুদের অনেক বিবাদ হয়েছে। বহু মানুষ নৌকাতেই মারা গেছে,” বলছিলেন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সোহেল রানা।

খোদেজা বেগম এবং তার সহযাত্রীদের এই দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রার শুরু ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশে শরণার্থীর জীবন পেছনে ফেলে তারা মালয়েশিয়ায় এক নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছিলেন।

“আমরা থাকতাম বার্মার রাখাইন রাজ্যের বুচিডং। আমার স্বামী কৃষিকাজ করতো। আমাদের কিছু জমি-জমা ছিল। কোনরকমে আমাদের চলে যেত। ২০১৭ সালে বার্মায় মিলিটারি এসে আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করলো। আমাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দিল। আমার স্বামী আর একটা ছেলে তখন মিলিটারির হাতে মারা যায়। তারপর আমরা পালিয়ে আসলাম বাংলাদেশে।”

টেকনাফের নয়াপাড়ায় যে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, সেখানে ঠাঁই হয়েছিল খোদেজা বেগম আর তার ছেলে-মেয়েদের। তার বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামীর সঙ্গে আলাদা সংসারে থাকে। কিন্তু ছেলে নুরুল ইসলাম (২৫) এবং ছোট মেয়ে সুমাইয়া (১১) তার সঙ্গেই থাকে।

“মালয়েশিয়া যাওয়ার চিন্তাটা এসেছিল আত্মীয়-স্বজনের কথা শুনে। যেসব রোহিঙ্গারা সেখানে গেছে, ওরা নাকি ভালো আছে। আমরাও তখন মালয়েশিয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।”

খোদেজা বেগম তার কিছু জমানো টাকা এবং স্বর্ণালংকার বিক্রি করে মোট ৬০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে।

“একদিন অনেক রাতে মোবাইল ফোনে কল আসলো। ফোনের অপর পাশের লোকটা আমাকে বললো, তোমরা এখন টেকনাফের স্টেশনের ওখানে আসো। আমাদের খুব বেশি জিনিসপত্র নেই। আমরা তিনজন একটা ব্যাগে কাপড়-চোপড় নিলাম। আমার কিছু সোনার গয়না ছিল, সেটা সাথে নিলাম। কেউ যেন সন্দেহ না করে, সেজন্যে আগেই আমি সবাইকে বলেছিলাম, আমি ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছি। এরপর ঘরে তালা লাগিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।”

টেকনাফ বাস স্ট্যান্ডে যখন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন তারা, হঠাৎ একটা সিএনজি আসলো। ড্রাইভার তাদের সেটিতে উঠতে বললো। তারপর দ্রুত চালিয়ে নিয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে একটা বাড়িতে। সেখানে অপেক্ষা করছে তাদের মতই আরও বহু মানুষ। তারপর সবাইকে নিয়ে গেল নদীর ধারে এক বালুচরে।

“সেখানে একটা সাম্পান ছিল। আমাদের ৩০/৩২ জন মানুষকে ঐ সাম্পানে তোলা হলো। এরপর সেটি থেকে তোলা হলো আরেকটা বড় নৌকায়। এরপর দুই দিন দুই রাত আমরা এই নৌকায় ছিলাম।”

খোদেজা বেগম অনুমান করেন, বাংলাদেশের জিঞ্জিরা (সেন্ট মার্টিন) এবং বার্মার আকিয়াবের মাঝামাঝি সাগরে এই নৌকাটি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যে জাহাজে করে তারা মালয়েশিয়ায় যাবেন, সেটি এই এলাকাতেই থাকার কথা ছিল।

“শেষ পর্যন্ত আমাদের যে জাহাজটিতে তোলা হলো, সেটি ছিল আসলে কাঠের তৈরি একটা বিরাট নৌকা। এটি যারা চালাচ্ছিল, তারা সবাই মগ (জাতিগত বার্মিজ)। জাহাজের ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে সবাই।”

জাহাজটি সেখানে ঘোরাঘুরি করছিল প্রায় ৮ দিন ধরে। ছোট ছোট নৌকায় করে আরও মানুষ এনে সেটিতে তোলা হচ্ছিল। অনেক মানুষ। নানা বয়সী পুরুষ, নারী এবং শিশু।

“ঠিক কত মানুষ ছিল বলতে পারবো না। চার-পাঁচশোর বেশি। পরে শুনেছিলাম ৫২৮ জন নাকি সেটিতে ছিল। সব মানুষ তোলা শেষ হলে আমরা মালয়েশিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।”

“যখন আমরা বড় নৌকায় উঠে গেলাম, তখন আমার আর অতটা ভয় করছিল না। আমি তখন মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি। আমার কষ্টের জীবনটা পেছনে ফেলে একটা নতুন জীবন পাব, ভালো থাকবো, ভালো খেতে-পরতে পারবো, এই আশায় আমি বিভোর ছিলাম। তাই কোন কষ্ট হলেও সেটা মেনে নিচ্ছিলাম।”

নৌকার সামনের অংশটা ছিল খোলা। পেছনে ছিল একটা কাঠের কেবিন। সেখানে দুটি তলা। মেয়েদের রাখা হয়েছিল মাঝখানের তলায়। একদম উপরে থাকতো জাহাজের ক্যাপ্টেন। আর তাদের লোকজন। বাকী সবাই নীচের খোলে। নৌকায় টয়লেট, গোসল করা- এসবের সেরকম কোন ব্যবস্থা ছিল না।

“পেছনের দিকে দুটি কাঠের তক্তা দিয়ে একটা ল্যাট্রিন বানানো হয়েছিল। দুই তক্তার ফাঁক দিয়ে একদিন একটা বাচ্চা ছেলে সাগরের পানিতে পড়ে যায়। সেখানেই পানিতে ডুবে মারা যায় ছেলেটি।”

এটি ছিল এই ভাগ্যবিড়ম্বিত নৌকার যাত্রীদের মধ্যে প্রথম কোন মৃত্যুর ঘটনা।

মালয়েশিয়ার উপকূলে

বাংলাদেশের উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করার পর মাত্র সাতদিনেই মালয়েশিয়ার উপকূলে গিয়ে পৌঁছায় নৌকাটি। প্রথমবারের এই যাত্রায় তাদের নৌকাটি ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়েছিল।

“সাগরে বড় বড় ঢেউ উঠছিল। নৌকা যখন বড় ঢেউয়ের ওপর থেকে আছড়ে পড়তো, তখন আমার ভীষণ ভয় করতো। ‍সারাদিন আমরা কেবল দোয়া-দরুদ পড়তাম। কলেমা পড়তাম। মরে যাচ্ছি মনে করে যে কতবার শেষবারেরর মতো কলেমা পড়েছি।”

“মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় আমাদের খাবারের বেশি সমস্যা ছিল না। প্রতিদিন দুই প্লেট করে ভাত দেয়া হতো। সাদা ভাত বা সাথে একটু ডাল। প্রতিদিন এক মগ পানি পেতাম।”

নৌকার নাবিকরা সারাদিন দূরবীনে নজর রাখতো চারদিকে। যাতে কোন দেশের উপকূলরক্ষী বা নৌবাহিনীর খপ্পরে পড়তে না হয়।

“ওরা যখনই দূরে কোন জাহাজ বা নৌকা দেখতো সাথে সাথে আমাদের নৌকার দুটি ইঞ্জিনই একসঙ্গে চালিয়ে দিয়ে দ্রুত অন্যদিকে চলে যেত।”

মালয়েশিয়ার উপকূলে নৌকাটি অপেক্ষা করেছিল দুদিন। নৌকার ক্যাপ্টেন জানিয়েছিল, রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য মালয়েশিয়া থেকে নৌকা আসবে। কিন্তু কেউ আসলো না।

করোনাভাইরাস

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে যখন খোদেজা বেগম রওনা দিয়েছিলেন, তখন কোভিড নাইনটিন বা করোনাভাইরাসের কথা কিছু জানতেন না।

“আমরা যখন রওনা দেই তখন করোনাভাইরাসের কথা শুনিনি। এটির কথা আমরা প্রথমে শুনি জাহাজে। আমরা মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নৌকার ক্যাপ্টেন একদিন ওয়ারলেসে কাদের সঙ্গে যেন কথা বলছিল। আমরা শুনেছি, ওরা বলাবলি করছিল, যে মালয়েশিয়ায় কোভিড-নাইনটিন বলে কি একটা রোগ ছড়িয়েছে।”

পাঁচশোর বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে খোদেজা বেগমদের জাহাজ যতদিনে মালয়েশিয়ায় পৌঁছায়, ততদিনে করোনাভাইরাসের কারণে সীমান্তে জারি হয়েছে ভীষণ কড়াকড়ি। কোস্টগার্ড আর নৌবাহিনী সারাদিন উপকূলে টহল দিচ্ছে। আকাশে চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার।

“নাবিকরা বললো, মালয়েশিয়ায় করোনাভাইরাস চলছে সেজন্য আমাদেরকে মালয়েশিয়ায় ঢুকানো যাচ্ছে না।”

“মালয়েশিয়ায় ঢুকতে না পেরে আমাদের নৌকা ফিরে আসলে থাইল্যান্ডের কাছে। আমরা জানি না নৌকার নাবিকরা আমাদের সত্যি কথা বলছিল কীনা। রাতের অন্ধকারে তারা আমাদের কোনদিকে নিচ্ছে আমাদের তো বোঝার উপায় নেই।”

থাইল্যান্ডের উপকূলে নৌকায় কিছু রসদপত্র তোলা হয়েছিল। সেই সরবরাহ এসেছিল ছোট ছোট নৌকায়। এরপর থাইল্যান্ড থেকে নৌকা চলে আসে বার্মার উপকূলের কাছে। সেখানেই সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এটি।

“একদিন অনেক রাতে মিয়ানমারের নৌবাহিনি এসে আমাদের নৌকা তাড়া করে ধরলো। আমাদের জাহাজের যে দুই নম্বর ক্যাপ্টেন ছিল, তাকে খুব মারলো। তারপর চারজনকে তাদের জাহাজে নিয়ে গেল। আমি শুনেছি ওদের নাকি খুব মারধোর করেছিল। তারপর অবশ্য ওদের ছেড়ে দেয়। আমি শুনেছি তাদের কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়েছিল।”

ততদিনে নৌকায় খাবার আর পানির তীব্র সংকট শুরু হয়েছে। প্রথমদিকে দুই বেলা খাবার দেয়া হলেও, ধীরে ধীরে খাবারের পরিমাণ কমতে থাকে। পানির সংকট শুরু হয়। নৌকার রোহিঙ্গাদের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়। নাবিকরা তখন দ্বিতীয়বার মালয়েশিয়ায় ঢোকার চেষ্টা চালায়।

“এবারের মালয়েশিয়ার কোস্টগার্ড আমাদের আটকে দেয়। ওরা বললো, এখানে কোভিড নাইনটিন চলছে। তোমরা যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। এরপর আমরা মালয়েশিয়া থেকে ফিরে বার্মার কাছে চলে আসি।

ততদিনে জাহাজে যেন মড়ক লেগেছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে।

“কখনো একজন মরছে, কখনো দুজন মরছে। কেউ দিনে মারা যাচ্ছে, কেউ রাতে মারা যাচ্ছে। রাতের বেলাতেই জানাজা পড়ে দরিয়ায় লাশ ফেলে দিচ্ছে, যাতে কেউ টের না পায়। লাশ ফেলার সময় ওরা জোরে শব্দ করে ইঞ্জিন চালাতো। যাতে লাশ ফেলার শব্দ শোনা না যায়। কত মানুষ মারা গেছে, গুনে বলতে পারবো না। তখন আমরা সবাই যার যার জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, হিসেব রাখার সময় ছিল না।”

খোদেজা বেগমের ধারণা, নৌকায় পুরুষরাই বেশি মারা গিয়েছিল, কারণ পুরুষরা যেখানে থাকতো, সেখানে গরম ছিল বেশি। গাদাগাদি করে গায়ে গা লাগিয়ে বসে থাকতে হতো তাদের। একজনের গায়ের ওপর আরেক জনের পা তুলে দিতে হতো। প্রচন্ড গরমে পানিশূন্যতায় ভুগে মারা গেছে বেশিরভাগ মানুষ।

“প্রথমদিকে আমাদের প্রতিদিন এক মগ করে পানি দিত। পরে আমাদের পানির পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হলো। তখন পানি নিয়ে আমাদের বেশ কষ্ট হয়েছিল।”

“আমাদের যখন পানি দিত না তখন অনেকে সাগরের লবণ পানিতে কাপড় চুবিয়ে তারপর কাপড় চিপে সেই নোনা পানি খেত। সাগরের পানি খেয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল।

ধর্ষণের গুজব এবং বিদ্রোহ

ততদিনে নৌকায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়ায় যেতে ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গারা বিক্ষুব্ধ। প্রতিদিন মৃত্যুর ঘটনা তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

“লোকজন তখন মরিয়া হয়ে বললো, আমরা কদিন এভাবে সাগরে ভাসবো। আমরা বললাম, আমাদের যে কোন দেশের কূল ধরিয়ে দাও। যদি আমাদের ধরে জেলে ঢুকিয়ে দেয়, ঢুকবো। আমরা তো এখানে এমনিতেই মারা যাচ্ছি।”

কিন্তু জাহাজের মগরা বললো, তোমাদের নামাতে গেলে, আমাদেরকেও ধরবে। জেলে ঢোকাবে। আমাদের জাহাজও নিয়ে যাবে।

অনেক কথাকাটির পর শেষ পর্যন্ত রফা হলো, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে একটা নৌকা চেয়ে পাঠাবে। সেই নৌকায় তাদের তুলে দেয়া হবে। কিন্তু সেই নৌকার ভাড়া তাদেরই দিতে হবে।

এই উত্তেজনা আরও চরমে পৌঁছালো নৌকার রোহিঙ্গা নারীদের ওপর মগদের অত্যাচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে।

“একটা মগ ছিল বেশি খারাপ, সে মানুষকে অনেক মেরেছিল। যেসব মেয়ে ছিল, তাদের ওপর অত্যাচার করতো। একদিন কিছু লোক নাকি ওকে মেরে সাগরে ফেলে দিল। বিরাট মারামারি শুরু হলো।”

নৌকার বার্মিজ ক্রুরা এরপর বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, সংখ্যায় তারা কম, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পেরে উঠবে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গারাও বুঝতে পারছিল, এই বার্মিজ ক্রুরা না থাকলে, তারা তীরে ফিরতে পারবে না।

শেষ পর্যন্ত একটা ফয়সালা হলো।

“ওরা বললো, তোমাদের যার কাছে যা টাকা আছে সব তোল। এভাবে এক লাখ টাকা তোলা হলো। এরপর যখন বাংলাদেশ থেকে একটা নৌকা ডাকার জন্য ওরা ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করলো। কিন্তু কেউ নাকি নৌকা পাঠাতে রাজী হলো না। যে ছোট নৌকা আমাদের এই জাহাজে তুলে দিয়েছিল, তারাও না।”

“তখন কিছু মানুষ এসে ঝগড়া থামালো। বললো, এরকম চললে তোমরাও মরবে, আমরাও মরবো।”

“মগরা তখন আকিয়াব থেকে একটা বোট ডাকলো। ফজরের আজানের সময় একটা বোট আসলো। সেটি থেকে আমাদের জাহাজে চার বস্তা চাল তুলে দিল। কয়েকটা কয়লার বস্তা দিল। তারপর তারা হুড়মুড় করে জাহাজ ছেড়ে পালালো।”

দুজন বার্মিজ ক্রু নৌকায় থেকে গিয়েছিল, পালাতে পারেনি। তাদের একজন নৌকাটি চালাতে পারতো। আরেকজন ছিল বাবুর্চি ।

“ওদের বলা হলো আমাদের বাংলাদেশে পৌছে দিতে। ওরাই জাহাজটাকে বাংলাদেশের টেকনাফের কূলে নিয়ে আসে।”

টানা প্রায় দু’মাস পর খোদেজা বেগম এবং তার সহযাত্রীরা তীরের দেখা পেলেন অবশেষে। ১৪ই এপ্রিল তাদের নৌকা এসে ভিড়লো টেকনাফের ঘাটে।

“প্রথম যখন তীর দেখলাম, এত যে খুশি লাগলো, বলতে পারবো না। পানিতে থাকতে থাকতে পানি দেখলেই মনে হতো যেন বাঘে ধরেছে। এত ভয় লাগতো। দুই মাস ধরে কেবল পানিতে ভেসেছি।

বাংলাদেশে কোস্ট গার্ড এই নৌকাটি থেকে উদ্ধার করেছিল মোট ৩৯৬ জন রোহিঙ্গাকে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তত্ত্বাবধানে তাদের দুসপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল। এখন তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে।

খোদেজা বেগম ক্যাম্পে ফিরে দেখেন, তিনি যে ঘরে থাকতেন, সেটিতে এখন থাকছে অন্য মানুষ। তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে অন্য মানুষের ঘরে।

“আমি সব হারিয়েছি। আমার কিছু নেই। অন্যের দয়ায় বেঁচে আছি। যে কষ্ট আমি পেয়েছি, সেই কষ্ট জীবনে ভুলবো না। আমি জীবনেও আর মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ভাববো না। যদি অন্য কেউ মালয়েশিয়া যেতে চায় তাকে বলবো, ভুলেও এই কাজ করো না।”