চার্জশিটে যাবজ্জীবনের ধারা পরিবার চায় ফাঁসি

নিউজ ডেস্ক
বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে এ মামলায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করবে তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এতে জাবালে নূরের দুই বাসের চালক, তাদের দুই সহকারী, দুই বাস মালিকসহ মোট ছয়জন আসামি হচ্ছেন। দণ্ডবিধির ৩০৪, ২৭৯ ও ৩৪ ধারায় তাদের অভিযুক্ত করা হবে। ৩০৪ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন। ঘটনার এক মাসের মধ্যেই আলোচিত এ মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

নিহত কলেজছাত্রী ও মামলার বাদী দিয়া খানম মীমের বাবা জাহাঙ্গীর ফকির গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, চালকের অপরাধ খুনের সমতুল্য। তাদের ফাঁসি দিতে হবে। যাবজ্জীবন সাজা এই অপরাধের জন্য যথেষ্ট নয়। ওই চালকদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্সই নেই। মা-বাবার কোল খালি করতে তাদের বুক এতটুকুও কাঁপেনি।

কোনো কাজের কারণে মৃত্যু হতে পারে অথবা মৃত্যু ঘটানোর অভিপ্রায় থেকে ও মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে এমন গুরুতর আঘাত করলে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি ৩০৪ ধারায় অভিযুক্ত হন। বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় এ মামলার চার্জশিটে ২৭৯ ধারা যুক্ত হচ্ছে। আর জড়িতদের ‘কমন ইনটেনশন’ ৩৪ ধারাতেও তারা অভিযুক্ত হবেন। তদন্তেও উঠে এসেছে, ঘটনাস্থলে অপেক্ষমাণ ছাত্রছাত্রীদের গায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি তুলে দিলে তারা মারা যেতে পারেন এটা জেনেও জাবালে নূরের দুই চালক পাল্লাপাল্লি করতে থাকেন। মূল ঘটনাস্থলের প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে থেকে তারা পাল্লাপাল্লির নামে মরণ খেলায় লিপ্ত হন। তার শেষ দৃশ্যটা বিমানবন্দরের সড়কের ফ্লাইওভারের ঢালুতে এসে রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। এতে প্রাণ যায় দুই শিক্ষার্থীর। আহত হন বেশ কয়েকজন। এ ঘটনার জের ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতসহ নয় দফা দাবিতে রাস্তায় নামেন। শিক্ষার্থীরা সড়ক ঘিরে জমে থাকা বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। আন্দোলনের মুখে চার বছরের বেশি সময় ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়।

২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও বিজ্ঞান বিভাগের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব। একই ঘটনায় আহত হন ১০-১৫ জন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর হোসেন ফকির ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্ত ডিবির কাছে স্থানান্তর হয়।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সমকালকে বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাসচাপায় নিহত দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার তদন্তও দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করা হয়েছে। তবে সব মামলার ক্ষেত্রে যৌক্তিক সময়ে তদন্ত শেষ করার একটা তাগিদ থাকে। নানা সীমাবদ্ধতায় অনেক সময় তা সম্ভব হয় না।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, এ মামলার তদন্ত পুরোপুরি শেষ। চলতি মাসেই চার্জশিট দাখিল করা হবে। তদন্তে মর্মন্তুদ সেই ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল তা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।

যারা আসামি হচ্ছেন :দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ মামলায় ছয়জনকে আসামি করা হচ্ছে। তারা হলেন- জাবালে নূর পরিবহনের সেই বাসচালক মাসুম বিল্লাহ ও তার সহকারী এনায়েত হোসেন এবং বাসটির মালিক শাহাদাত হোসেন। ওই বাসটি যে বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল ওই বাসের চালক জোবায়ের সুমন ও চালকের সহকারী কাজী আসাদ এবং বাসটির মালিক জাহাঙ্গীর আলম। মূলত দুই চালকের বাস চালানোর লাইসেন্স ছিল না। তবে তাদের মোটরসাইকেল ও হালকা যান চালানোর লাইসেন্স ছিল। তাদের কাছে পাওয়া গেছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) অপেশাদার চালকের লাইসেন্স কার্ড। এসব কার্ডে ইংরেজি বর্ণে লেখা আছে এলসি (হালকা যান)। এ ধরনের লাইসেন্স ব্যবহার করে কোনোভাবেই পেশাদার চালক হিসেবে ভারী যান চালানোর কথা নয়। জেনেশুনে এ ধরনের চালকের হাতে স্টিয়ারিং তুলে দেওয়ায় এ মামলায় দুই বাস মালিককে আসামি করা হচ্ছে। তবে একই পরিবহনের আরেকটি বাস প্রথমে পাল্লাপাল্লিতে জড়ালেও তার কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়নি। সেই বাসটি পাল্লাপাল্লিতে শেষ পর্যন্ত থাকা দুই বাসের পেছনে পড়ে যায়। স্বাভাবিক কারণেই তাই ওই বাসের চালক ও তার সহকারীকে আসামি করা হচ্ছে না। ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ওই বাসের চালক সোহাগ আলী ও তার সহকারী রিপনকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেন। পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে দুর্ঘটনাস্থলে তাদের বাসটি পার্ক করা ছিল। উত্তেজিত ছাত্ররা বাসটি ভাংচুর ও পুড়িয়ে দেয়। সোহাগ ও রিপন অভিযোগ থেকে রেহাই পাচ্ছেন। চার্জশিটে যাদের আসামি করা হচ্ছে তাদের মধ্যে চারজন বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। এখনও গ্রেফতার করা যায়নি জাবালে নূরের একটি বাসের চালকের সহকারী কাজী আসাদ ও মালিক জাহাঙ্গীর আলমকে। এ মামলায় দুই চালক মাসুম ও জোবায়ের ও এক বাসের মালিক শাহাদাত হোসেন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

দুই কিলোমিটার দূর থেকে পাল্লাপাল্লি :আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকেই জাবালে নূরের তিন বাসের মধ্যে শুরু হয়েছিল পাল্লাপাল্লি। আগেভাগে যাত্রী তোলা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামেন তিন চালক। এর মধ্যে একটি বাস পেছনে পড়ে গেলে অন্য দুই বাসের মধ্যে পাল্লা চলতে থাকে। বেপরোয়া গতিতে বাস দুটি চলতে থাকলে যাত্রীরাও আতঙ্কে চিৎকার-চেচামেচি শুরু করেন। তারা স্বাভাবিক গতিতে বাস চালাতে অনুরোধ করেন। তবে তাদের কথা পাত্তা না দিয়ে জোরে হর্ন বাজিয়ে দুই চালক ডানে-বামে এঁকেবেঁকে একে-অপরকে অতিক্রম করার মরণপণ খেলায় লিপ্ত হন। এতে দুই বাস বিমানবন্দর সড়কের ফ্লাইওভারের দু’পাশের রেলিংয়ে কয়েকবার ঘষা খায়। এ কারণে ভেঙে যায় বাসের গ্লাসও। এরপর ফ্লাইওভারের ঢালে অপেক্ষমাণ একটি বাসকে পেছন দিক থেকে অতিক্রম করতে গেলেই ঘটে সেই মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা। প্রাণ যায় দুই শিক্ষার্থীর।

চালক ও মালিকের জবানবন্দি :আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মাসুম জানান, ২০১২ সালে গাড়ির হেলপার হিসেবে পরিবহন লাইনে কাজ শুরু করেন তিনি। ২০১৭ সালে ড্রাইভিং শেখেন। গত এক বছর ধরে তিনি জাবালে নূর পরিবহনের বাস চালাচ্ছেন। এর জন্য প্রতিদিন গাড়ির মালিক পক্ষকে ৭০০ টাকা দিতেন মাসুম। ঘটনার দিন ২৯ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় আগারগাঁও থেকে বাস নিয়ে (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৯২৯৭) নতুন বাজারের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। অধিক যাত্রী আগেভাগে ওঠাতে পারলে বেশি টাকা পাওয়া যাবে এমন আশায় জাবালে নূরের অপর বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৭৫৮০) সঙ্গে ইসিবি চত্বর থেকে রেষারেষি শুরু হয়। ওই বাসটি বিমানবন্দর সড়কের ঢালুতে রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে থাকায় পেছন থেকে বামে দ্রুত ও বেপরোয়াভাবে গিয়ে সেখানে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীর গায়ের ওপর বাস তুলে দেন মাসুম। এরপর চালকের আসন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে গিয়ে বরগুনায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। এদিকে ওই বাসমালিক শাহাদত হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিতে বলেন, ২০১৬ সালে গাড়িটি কেনেন তিনি। কয়েক মাস তিনি নিজে গাড়ি চালান। এরপর জাবালে নূর পরিবহন মালিক সমিতির অনুরোধে মাসুম বিল্লাহকে তার গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে নিয়োগ দেওয়ার সময় মাসুসের ড্রাইভিং লাইসেন্স তিনি যাচাই-বাছাই করে দেখেননি।

তদন্তে যা পাওয়া গেল :পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, জাবালে নূরের যে দুই গাড়ি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী তার ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা। তারা প্রতিবেদন দিয়েছে দুর্ঘটনার সময় দুই বাসের ইঞ্জিন ভালো ছিল। তাই পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে এটা বিচার চলাকালীন উল্লেখ করার কোনো সুযোগ পাবে না আসামিপক্ষ। মূলত পেছনে থেকে ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৯২৯৭ নম্বরের গাড়িচালক মাসুম এসে তাড়াহুড়া করে বাঁ দিক থেকে অপর বাসকে অতিক্রম করে যাত্রী তুলতে গেলেই বাসটি ধাক্কা খায় পাশের একটি গাছের সঙ্গে। নিয়ম অনুযায়ী, সেখানে কোনো বাস থামানোর ও যাত্রী তোলার কথা নয়। ফ্লাইওভারের ঢাল স্বাভাবিক কারণেই বিপজ্জনক। চালক ও তাদের সহকারীদের যাত্রী তোলার অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনার ক্ষেত্র তৈরি হয়। যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার ফ্লাইওভারটি ২৩ ফুট চওড়া। চালকরা পাল্লাপাল্লি করলেও তাদের সহকারীরা তাতে বাধা না দেওয়ায় তারাও চার্জশিটে অভিযুক্ত হবেন।

editor

Lorem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry. Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s, when an unknown printer took a galley of type and scrambled it to make a type specimen book. It has survived not only five centuries