আড়াই বছরের শিশুটির ওপর এ কেমন বর্বরতা!

নূর মোহাম্মদ, কিশোরগঞ্জ:

জন্মের ৫ মাস বয়সে শিশুটিকে ফেলে এক ব্যাক্তির হাত ধরে পালিয়ে যায় মা। দুধের শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে আবারও বিয়ে করেন বাবা আব্দুল কদ্দুস। তবে বিধি বাম! কিছুদিন যেতে না যেতেই অভাবের তাড়নায় দিনমজুর স্বামী আর সতীনের সন্তানকে ছেড়ে পালিয়ে যান দ্বিতীয় স্ত্রীও! এর পর থেকে শিশুটিকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেয় বড় বোন চুমকি আক্তার। জন্মের পর মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত শিশুটিকে এবার অবিশ^াস্য নৃশংসতার শিকার হতে হলো।

 

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে রাতের আধাঁরে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আড়াই বছরের শিশু আব্দুল্লাহ আল-মামুনের পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় হতবাক শিশুটির স্বজন ও প্রতিিেশরা। রহস্যজনক এ ঘটনার পর শিশুটি প্রাণে বেঁচে গেলেও কাটছেনা আতংক। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছেনা দিনমজুর বাবা।

করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের জাটিয়াপাড়া গ্রামে এ বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এখনও থানায় মামলা হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, বিষয়টি তারা অবগত হয়েছন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, জাটিয়াপাড়া গ্রামের দিনমজুর আব্দুল কদ্দুসের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে আবদুল্লাহ আল-মামুন সবার ছোট। শিশুটির জন্মের ৫ মাস বয়সে তার মা পাশর্^বর্তি গ্রামের এক যুবকের হাত ধরে চলে যায়। শিশুটিকে রেখে ওই যুবককে বিয়ে করে সংসার পাতেন কদ্দুসের স্ত্রী। এ অবস্থায় ছেলেকে বাঁচাতে আবারও বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু অভাবের সংসারে স্বামী ও সতীনের সন্তান রেখে চলে যান ছোট স্ত্রীও। এ অবস্থায় আব্দুল কদ্দুসের ছোট মেয়ে চুমকি আক্তার ছোট ভাইকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়।

গত ৩১ মার্চ সন্ধ্যার পর আড়াই বছর বয়েসি ভাই আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে রেখে পাশের বাড়ির নলকূপ থেকে পানি আনতে যায় চুমকি আক্তার। এ সময় তার বাবা বাড়িতে ছিলেন না। এ সময় ঘুমন্ত শিশুটি হঠাৎ করে চিৎকার শুরু করে। চিৎকার শুনে দৌড়ে ছুটে আসে চুমকি। এ সময় চৌকিতে শুয়ে ছটফট করতে থাকা শিশুটির পুরুষাঙ্গ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে চুমকি। তার ডাক চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে শিশুটির গোপনাঙ্গ গোড়া থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে নেয়া অবস্থায় দেখতে পায়।

আশংকাজনক অস্থায় শিশুটিকে প্রথমে করিমগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে ও পরে তাকে কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ছেলেটির অবস্থার অবণতি হলে রাতেই তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিকতায় শিশুটি প্রাণে বেঁচে যায়। ১০ দিন চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়িতে আনা হয়।

নিস্পাপ শিশুটির সাথে নৃশংসতার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলে এ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য দেখা দেয়। বিষয়টি নজরে আসে গণমাধ্যম কর্মিদের।

শুক্রবার বিকেলে জাটিয়াপাড়া গ্রামে আব্দুল কদ্দুসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবার কোলে শিশুটি ছটফট করছে। লোকজন দেখলেই ভয়ে চিৎকার করে উঠে। নল দিয়ে বিকল্প উপায়ে প্রশ্রাবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শিশুটির বোন চুমকি আক্তার জানান, ‘ মা চলে যাওয়ার পর ভাইটিকে তিলে তিলে বড় করে তুলছি। তাকে রেখে কোথাও যাইনা। সেদিন তাকে খাওয়ানোর পর ঘুম পাড়িয়ে বাইরে রান্না করছিলাম। এক ফাঁকে পাশের বাড়ির টিউভওয়েল থেকে পানি আনতে যাই। এ সময় তার চিৎকার শুনে ঘরে এসে দেখি তার যৌনাঙ্গ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ঘরে কাউকে দেখতে পাইনি। আমি চিৎকার করতে থাকলে লোকজন ছুটে আসে। তারা দেখতে পায় আমার ভাইয়ের গোপনাঙ্গ গোড়া থেকে ধারালো কিছু দিে কেটে নেয়া হয়। কিভাবে এটা হলো, কারা করেছে জানিনা। তবে আমি এর বিচার চাই।’

শিশুটির বাবা আব্দুল কুদ্দুস জানান, ‘ আমি বাড়িতে ছিলাম না। ভাইয়ের ফোন পেয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে যাই। দুই স্ত্রী চলে যাওয়ার পর আমার পুত্রকে নিয়ে বিপাকে পড়ি। মেয়েটি তার ভাইকে লালন-পালন করছে।’ এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বলেন, ‘ আমার নিস্পাপ সন্তানের সাথে এ কেমন শত্রæতা। তারা আমাকে মেরে ফেলতো। আমার সন্তান কার কি ক্ষতি করেছে? আমি এ ঘটন্য ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’

এ ঘটনায় বিষ্ময়ে হতবাক এলাকাবাসী। জাটিয়াপাড়া গ্রামের সমাজসেবক মোজাম্মেল হক অপু বলেন, ‘ এমন ঘটনা আমরা কখনো শুনিনি। আমরা হতবাক। এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’ গুজাদিয়া হাইধনখালী গ্রামের ইমরানুল হক ইমরান জানান, ‘ একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান শিশুটি। হাসপাতাল থেকে ছুটি দেয়া হলেও তাকে আবারও হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু টাকার অভাবে তার বাবা শিশুটিকে চিকিৎসা দিতে পারছেনা। আমরা সাধ্যমতো পরিবারটিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। জঘন্য এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

যোগাযোগ করা হলে করিমগঞ্জ থানার ওসি মোমিনুল ইসলাম জানান, ‘বিষয়টি শুনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। শিশুটির স্বজনরা হাসপাতালে থাকায় কেউ এখনও অভিযোগ দায়ের করেননি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

দৈনিক আমার বাংলাদেশ

দৈনিক আমার বাংলাদেশ